সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ওজন নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা, কিংবা রেস্টুরেন্টে গিয়ে পছন্দের কাচ্চি বাদ দিয়ে ক্যালরির ভয়ে বোরিং সালাদ অর্ডার করা—এই টক্সিক রিলেশনশিপে অনেকেই আটকা। ডায়েট করতে করতে যারা ক্লান্ত, যাদের কাছে প্রতিটি দানা খাবার মানেই এক একটা অপরাধবোধ, তাদের জন্য আজ এক মহাজাগতিক ছুটির দিন।
ক্যালেন্ডারের পাতা আজ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে আজ ৬ মে— আন্তর্জাতিক ‘নো ডায়েট ডে’। আজ সেই দিন, যখন আপনার ওজন মাপার মেশিনটিকে আলমারির এক কোণে বন্দি করে রেখে ইচ্ছামতো পছন্দের খাবারটি এনজয় করার অফিশিয়াল লাইসেন্স আপনার হাতে।
কিভাবে আসলো এই দিবস
পালন করার আগে আপনাকে তো অবশ্যই জানতে হবে এই দিবসের পিছনের গল্পটা। এই দিবসের ইতিহাসটা কিন্তু বেশ সিরিয়াস এবং ইমোশনাল।
১৯৯২ সালে ব্রিটিশ নারী মেরি ইভান্স ইয়ং এই আন্দোলনের সূচনা করেন। মেরি নিজে একসময় ‘অ্যানোরেক্সিয়া’ নামক এক মরণব্যাধির শিকার হয়েছিলেন। এই রোগে মানুষ খিদে থাকা সত্ত্বেও ওজন বাড়ার ভয়ে খাবারের প্রতি এক তীব্র ভীতি কাজ করে।
সুস্থ হয়ে ওঠার পর মেরি বুঝতে পেরেছিলেন, আমাদের সমাজ শরীর নিয়ে যে ‘অবাস্তব পারফেকশন’ দাবি করে, তা কতখানি ক্ষতিকর। তিনি গড়ে তোলেন ‘ডায়েট ব্রেকার্স’ এবং ঘোষণা করেন ‘নো ডায়েট ডে’। তার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, বডি শেমিং বন্ধ করা এবং মানুষকে নিজের শরীরের প্রশংসা করতে শেখানো।
ডায়েট মানেই কি সুস্থতা?
মেডিক্যাল সায়েন্স বলছে, অতিরিক্ত কড়াকড়ি বা ‘ক্রাশ ডায়েট’ শরীরের মেটাবলিজম নষ্ট করে দেয়। ‘নো ডায়েট ডে’ আমাদের শেখায়—
• হেলদি বাউন্ডারি: ডায়েট মানে খাবার বর্জন নয়, বরং খাবারের সাথে একটি পজিটিভ রিলেশনশিপ তৈরি করা।
• বডি নিউট্রালিটি: ওজন যাই হোক, আপনার শরীর আপনার জন্য প্রতিদিন লড়াই করছে। একে ভালোবাসা আপনার দায়িত্ব।
• টক্সিক কালচার বর্জন: ওজন কমানোর চাপে অনেকে অ্যানোরেক্সিয়ার মতো ডিসঅর্ডারে ভোগেন। আজকের দিনটি সেইসব মানসিক জটিলতা নিয়ে সচেতন হওয়ার দিন।
খাবারের সাথে গড়ুন এক নতুন সম্পর্ক
ডায়েট মানেই যদি হয় বঞ্চনা আর পছন্দের খাবার থেকে দূরে থাকা, তবে সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে আজই। আন্তর্জাতিক নো ডায়েট ডে উপলক্ষে নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. বডি পজিটিভিটি চর্চা করুন
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের খুঁতগুলো না খুঁজে, নিজের শরীরের সক্ষমতা নিয়ে ভাবুন। আপনার শরীর আপনাকে প্রতিদিন চলাফেরা করতে, কাজ করতে এবং বেঁচে থাকতে সাহায্য করছে—এই কৃতজ্ঞতাটুকু প্রকাশ করুন। মনে রাখবেন, সুস্বাস্থ্য কোনো নির্দিষ্ট ওজনে সীমাবদ্ধ নয়।
২. ‘গিল্টি প্লেজার’ থেকে অপরাধবোধ সরান
প্রতি বেলা খাওয়ার আগে ক্যালরি মেপে নিজেকে অপরাধী ভাবা বন্ধ করুন। পুষ্টিবিজ্ঞান অনুযায়ী, মানসিক চাপ নিয়ে খাবার খেলে তা হজমে ব্যাঘাত ঘটায়। তাই আজ অন্তত পছন্দের সেই ব্রাউনি বা কাচ্চি বিরিয়ানিটি তৃপ্তি নিয়ে উপভোগ করুন। মনে রাখবেন, মাঝেমধ্যে পছন্দের খাবার খাওয়া কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি মানসিক প্রশান্তির একটি অংশ।
৩. শরীরচর্চা হোক ভালোবাসার জায়গা থেকে, শাস্তির নয়
ব্যায়াম করুন শরীরকে শক্তিশালী করতে, কেবল ক্যালরি বার্ন করার জন্য নয়। যখন আপনি শরীরচর্চাকে ওজন কমানোর ‘শাস্তি’ হিসেবে দেখবেন, তখন তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। প্রিয় কোনো খেলা, নাচ বা হাঁটাহাঁটি বেছে নিন যা আপনি আনন্দ নিয়ে করতে পারেন।
৪. টক্সিক ডায়েট কালচারকে ‘না’ বলুন
সোশ্যাল মিডিয়ায় নিখুঁত শরীরের অবাস্তব বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হবেন না। যে ডায়েট আপনাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে বা শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করে, তা বর্জন করাই শ্রেয়। সুস্থতার জন্য ডায়েট চার্টের চেয়ে শরীরের স্বাভাবিক সংকেত (খিদে পাওয়া বা পেট ভরা) বোঝা বেশি জরুরি।
৫. অ্যানোরেক্সিয়া ও ইটিং ডিসঅর্ডার নিয়ে সচেতন হোন
খাবার নিয়ে ভীতি বা ওজন বাড়ার তীব্র আতঙ্ক অনেক সময় বড় ধরনের শারীরিক ও মানসিক রোগের জন্ম দেয়। যদি খাবার নিয়ে আপনার মধ্যে অস্বাভাবিক ভয় কাজ করে, তবে পেশাদার পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
লাইফটা খুবই ছোট। আর এই ছোট লাইফে পছন্দের স্বাদগুলো এনজয় করা কোনো ক্রাইম নয়। ভারসাম্য বজায় রাখুন, পুষ্টিকর খাবার খান, কিন্তু মনের তৃপ্তিকে বিসর্জন দিয়ে নয়। আজ অন্তত ডায়েট চার্টকে ছুটি দিয়ে নিজের শরীরের সাথে নতুন করে বন্ধুত্ব করুন।
