গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী, যার মধ্যে ১ হাজার ৭০০ শ্রমিক রয়েছেন, কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ জুন থেকে কারখানাটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও প্রশাসনের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিটসহ সব আইনানুগ পাওনা আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এক বছরে বন্ধ ৪৫৭ কারখানা
শিল্প গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের শিল্প অধ্যুষিত সাতটি এলাকায় মোট ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—
- ২০৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশের অভাবে
- ১৯০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে মালিকদের আর্থিক সংকটে
- ১১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে
- ৫১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের অভাব ও স্থানান্তরসহ অন্যান্য কারণে
অর্থাৎ, মোট বন্ধ হওয়া কারখানার ৮৬ দশমিক ৪৩ শতাংশের প্রধান কারণ অর্ডার সংকট ও আর্থিক দুরবস্থা।
সবচেয়ে বেশি কারখানা বন্ধ গাজীপুরে
দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে বর্তমানে মোট কারখানার সংখ্যা ১০ হাজার ২৩৮টি। এর মধ্যে বন্ধ হওয়া কারখানার সংখ্যা—
- গাজীপুর: ১৫৫টি
- আশুলিয়া: ১২৪টি
- চট্টগ্রাম: ১১৯টি
- নারায়ণগঞ্জ: ৩৮টি
- ময়মনসিংহ: ৮টি
- কুমিল্লা: ৭টি
- খুলনা: ৬টি
সিলেট অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া কোনো কারখানার তথ্য পাওয়া যায়নি।
শ্রমিক পাওনা পরিশোধে বিলম্ব বড় সমস্যা
শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন বলেন, অধিকাংশ কারখানাই শ্রম আইন অনুযায়ী নোটিশ দিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করছে। তবে প্রধান সমস্যা হচ্ছে শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য পাওনা সময়মতো পরিশোধ না করা।
তিনি বলেন, “নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মালিকপক্ষ প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হয়। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়ে পড়ে।”
পোশাক ও বস্ত্র খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
বন্ধ হওয়া ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে—
- বিজিএমইএ সদস্য: ১০৮টি
- বিকেএমইএ সদস্য: ৩৫টি
- বিটিএমএ সদস্য: ৮টি
- বেপজা-সংশ্লিষ্ট: ১৯টি
- অন্যান্য: ২৮৭টি
মোট ১৫১টি কারখানা, অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্ট।
প্রণোদনায় আগ্রহী ৩২২ কারখানা
বন্ধ ও সংকটে থাকা কারখানাগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা কর্মসূচিতে ইতোমধ্যে ৩২২টি কারখানা আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বিজিএমইএ সূত্র জানায়, এর মধ্যে—
- ১৯৯টি কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ
- ১২৩টি কারখানা আংশিক বন্ধ
বর্তমানে এসব কারখানার যোগ্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
বহুমুখী সংকটে শিল্প খাত
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, অর্ডার কমে যাওয়া, ব্যাংক ঋণ সংকোচন, জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক কারখানা টিকে থাকার লড়াই করছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, অর্ডার সংকট থেকে শুরু হওয়া সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সংকটে পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এলসি খুলতে না পারায় কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিপদগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঢালাও নীতি গ্রহণ না করে প্রকৃত সম্ভাবনাময় কারখানাগুলোকে বেছে নেওয়া প্রয়োজন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “যেসব কারখানা সম্প্রতি বন্ধ হয়েছে, তাদের পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে। তবে সহায়তা দেওয়ার আগে থার্ড-পার্টি অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা যাচাই এবং একটি বাস্তবসম্মত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “প্রকৃত সংকটে থাকা এবং পুনরায় চালু হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে—এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়াই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।”
