পরিকল্পনাহীনতা, জ্বালানী ক্রয়ের সিদ্ধান্তহীনতা এবং বেসরকারি অলিগার্ক তোষণ নীতির কারণে দেশে নজিরবিহীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। আজ এক বিবৃতিতে তিনি বর্তমান বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ভেঙে সরকার জনগণের স্বার্থের বদলে গুটিকয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত।
প্রতিশ্রুতির উল্টো পথে হাঁটার অভিযোগ
নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, নির্বাচনে বিএনপি ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা’ নীতি এবং কালাকানুন বাতিলের স্পষ্ট অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যেই সরকার নিজেদের প্রতিশ্রুত চুক্তি ভঙ্গ করেছে।
বিপিসির নীতিমালার খসড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস বড় পরিমাণে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও নিজস্ব ব্যবস্থায় বাজারজাতের অনুমতি চেয়ে সরকারকে চিঠি দেয়। এরপরই ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিপিসিকে মাত্র ৪ দিন সময় দিয়ে ১০ আগস্টের মধ্যে ‘বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা ২০২৬’ র খসড়া জমা দিতে বলে। এর বিপক্ষে মত দিলে বিপিসি চেয়ারম্যানকে অন্যায় ভাবে সরিয়ে দেয়া হয়।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিনে নামিয়ে আনার ফলে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা অংশ নিতে পারবে না, যা অলিগার্ক ও সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি করবে।
‘সংকট অর্থের নয়, সঠিক সময়সূচির’
সরকার জ্বালানি ক্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বা ডলারের অভাবের কথা বললেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে তা খণ্ডন করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দেশের গ্রস রিজার্ভ প্রায় ৩৬.৯ বিলিয়ন ডলার এবং ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। উপরন্তু, রেমিট্যান্স প্রবাহও ইতিবাচক।
“বাস্তবে ডলার আছে। নেই ক্রয়ের টাইমলি শিডিউল। সময়সূচি ভিত্তিক ক্রয় পরিকল্পনা,” উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে পছন্দের সরবরাহকারীকে সুবিধা দিতে গিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পুরো খাত বেসরকারিকরণের পাঁয়তারা করা হচ্ছে কি না।
যুদ্ধের অজুহাত ও জাতীয় সক্ষমতা
দেশে রেকর্ড লোডশেডিং এবং ৪১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকার বিষযে সরকার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে দায়ী করলেও পিজিসিবির তথ্য টেনে নাহিদ ইসলাম দেখান যে, এপ্রিল ও জুলাই মাসেই লোডশেডিং চরম আকার ধারণ করেছিল। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগেই এই সংকট তৈরি করা হয়েছে।
মহেশখালীর এফএসআরইউ (FSRU) দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দেশের গ্যাস সরবরাহের এক-চতুর্থাংশ যে দুটি টার্মিনালের ওপর নির্ভর করে, তার একটি বসে গেলে পনেরো দিন লাগলো আংশিক পুনরুদ্ধারে, এই ডিজাস্টার রিকভারি সক্ষমতা কি একটি রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য?”
১৫ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা
সংকট সমাধানের লক্ষ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষে ১৫ দফা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাব পেশ করেন নাহিদ ইসলাম:
- তাৎক্ষণিক (৩০ দিন): তড়িঘড়ি বেসরকারিকরণ স্থগিত করা, আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিনে ফিরিয়ে আনা, বিপিসির চার থেকে ছয়টি প্রান্তিকের ক্রয় ক্যালেন্ডার প্রকাশ, মহেশখালী এফএসআরইউ দুর্ঘটনার স্বাধীন কারিগরি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং শিল্প খাতে গ্যাস বরাদ্দে ডেটা-ভিত্তিক অগ্রাধিকার সূচক চালু।
- মধ্যমেয়াদি (৬-১৮ মাস): একক মাফিয়া মনোপলি এড়িয়ে উন্মুক্ত দরপত্র চালু, অপরিশোধিত তেল আমাদানির সুযোগ দিয়ে দেশে রিফাইনারি তৈরিতে উৎসাহিত করা, ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণ নিরীক্ষা করে অবৈধ অর্থ ছাড় বন্ধ করা, প্রি-পেইড/স্মার্ট মিটারিং বাধ্যতামূলক করা এবং এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে আনা।
- দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ: ৩য় ও ৪র্থ এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক মানের পিএসসি (PSC) চূড়ান্তকরণ, বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিদেশি অংশীদার গ্রহণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,০০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ বাস্তবায়নে সোলার সরঞ্জামের শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা।
বিবৃতির শেষে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “জ্বালানি খাত জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এখানে ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দেয় কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, ছোট ব্যবসায়ী… মাফিয়া তোষণের মূল্য বাংলাদেশ একবার দিয়েছে, আর নয়। এবারের ভুল, ব্যর্থতা ও অলিগার্ক তোষণের নীতি এনসিপি রুখে দাঁড়াবে।”
