১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দেশীয় সহযোগী হিসেবে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখেই জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে।
বৃহস্পতিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আজম খান বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।
বিরোধী দলের আপত্তি
বিলটি পাসের আগে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সংসদে এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি নির্দিষ্ট কোনো ধারার সংশোধন প্রস্তাব না দিলেও আইনের সংজ্ঞায় রাজনৈতিক দলগুলোর নাম অন্তর্ভুক্ত করার কঠোর সমালোচনা করেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন:
“’৭১ সালের সেই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল, আল্লাহই তার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষী। আমরা আর এই জাতিতে কোনো বিভক্তি চাচ্ছি না।”
তিনি দাবি করেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সরকার কিংবা জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকার কেউই আইনের সংজ্ঞায় এভাবে রাজনৈতিক দলের নাম আনেনি। এই ধারাটি শেখ হাসিনার আমল থেকে শুরু হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এনসিপির সমর্থন ও সংসদীয় প্রক্রিয়া
বিরোধী দলের আপত্তির বিপরীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিলটির প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। দলটি লিখিতভাবে স্পিকারকে জানায় যে, এই বিল নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। স্পিকার উল্লেখ করেন যে, বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য মূলত সাধারণ আলোচনা, নির্দিষ্ট কোনো সংশোধনী নয়। এরপর বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
বিলে যা থাকছে
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২২ সংশোধন করে আনা এই বিলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে:
- বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা: ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগী—রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করেছেন, তারাই ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে গণ্য হবেন।
- মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য: বিলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র পরিবর্তে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ‘মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য’ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করা হয়েছে।
- মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী: প্রথমবারের মতো প্রবাসী সরকারের কর্মচারী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যদের ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
২০২৫ সালের অধ্যাদেশ রহিত
এই বিল পাসের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ রহিত করা হয়েছে। তবে ওই অধ্যাদেশের অধীনে ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া সকল কার্যক্রম এই নতুন আইনের অধীনে বৈধ বলে গণ্য হবে।
সংসদের বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিলটি পর্যালোচনার সময় জামায়াতের সদস্যরা সেখানে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন, যার প্রতিফলন আজ সংসদে দলটির আমিরের বক্তব্যে দেখা গেছে।
