দেশের ৬৪ জেলার ৫২৬টি স্থানে পরিচালিত জরিপে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে—শব্দদূষণের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। বিশেষ করে একটি হাসপাতাল এলাকায় দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ১১০.৯০ ডেসিবল শব্দ রেকর্ড করা হয়েছে, যা নির্ধারিত মানমাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশগ্রহণমূলক প্রকল্প’-এর আওতায় ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ জরিপ পরিচালিত হয়। এতে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রংপুর ও রাজশাহীর একাধিক এলাকা উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।
শীর্ষ শব্দদূষণ (দিনের বেলা)
- চট্টগ্রাম (বিবিএমএইচ এলাকা) — ১১০.৯০ ডেসিবল
- ঢাকা (পল্লবী, সিরামিক রোড) — ১০৯.২০ ডেসিবল
- রংপুর (গুঞ্জন মোড়) — ১০৫.২০ ডেসিবল
- ঢাকা (তেজগাঁও সাতরাস্তা) — ১০২.১০ ডেসিবল
- চট্টগ্রাম (পাঠানটুলী) — ১০১.১০ ডেসিবল
উল্লেখ্য, নীরব এলাকায় অনুমোদিত শব্দমাত্রা দিনে মাত্র ৫০ ডেসিবল।
রাতের শীর্ষ শব্দদূষণ
- রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা — ১০০.৮০ ডেসিবল
- রাজশাহী (বিন্দুর মোড়) — ১০০.৫০ ডেসিবল
- চট্টগ্রাম (ওয়্যারলেস ডায়াবেটিক হাসপাতাল এলাকা) — ৯৯.৫০ ডেসিবল
- চট্টগ্রাম (কালামিয়া বাজার) — ৯৯.৫০ ডেসিবল
অথচ নীরব এলাকায় রাতে অনুমোদিত মাত্রা ৪০ ডেসিবল।
উদ্বেগজনক দিক
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালকে ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সেখানে এত উচ্চমাত্রার শব্দ পাওয়া চরম উদ্বেগজনক। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, হর্ন, নির্মাণকাজ ও শিল্পকারখানার শব্দই প্রধান কারণ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান বলেন—
“জরিপ চলাকালে দিনে বিবিএমএইচ এলাকা এবং রাতে ওয়্যারলেস এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা অত্যধিক পাওয়া গেছে।”
“গাড়ির চাপ ও অতিরিক্ত হর্ন ব্যবহারের কারণেই এসব এলাকায় শব্দদূষণ বেশি।”
তিনি আরও বলেন—
“স্বাভাবিকভাবে মানুষ ৪০ থেকে ৫০ ডেসিবল শব্দ সহ্য করতে পারে। অতিরিক্ত শব্দে বধিরতা ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদে নানা রোগ হতে পারে।”
স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত শব্দদূষণ হতে পারে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ:
- শ্রবণশক্তি হ্রাস বা স্থায়ী বধিরতা
- হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ
- অনিদ্রা ও মানসিক চাপ
- স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীরা বেশি ঝুঁকিতে।
জরিপের সারসংক্ষেপ
- মোট জরিপ স্থান: ৫২৬টি
- ঢাকা বিভাগ: ১৭০টি
- চট্টগ্রাম বিভাগ: ৯১টি
- অন্যান্য বিভাগ মিলিয়ে বাকি স্থানগুলোতে জরিপ
- ঢাকার ৬৮টি পয়েন্টে ৬৬–১০০+ ডেসিবল শব্দ
- অন্যান্য জেলার ১০০টির মধ্যে ৮১টিতে অতিরিক্ত শব্দ
সমাধানে সচেতনতার উপর জোর
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ফরিদ উদ্দিন বলেন—
“যেখানে মানুষের চলাচল ও যানবাহন বেশি, সেখানেই শব্দের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে।”
“শুধু মামলা বা জরিমানা দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়—মানুষ সচেতন হলেই শব্দদূষণ কমবে।”
প্রতিকারমূলক উদ্যোগ
শব্দদূষণ কমাতে ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে গাড়িচালকদের হর্ন ব্যবহার কমানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে।
দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অপ্রয়োজনীয় হর্ন ও উচ্চশব্দের যন্ত্রপাতির ব্যবহারে দেশে শব্দদূষণ দিন দিন বাড়ছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
