ঢাবিতে অনার্স বন্ধ ও হেরিটেজ সিটি ঘোষণা: মাহফুজ আলমের বৈপ্লবিক প্রস্তাবনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক ও সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। আজ এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রূপান্তরের প্রস্তাব দেন।

মাহফুজ আলম তাঁর স্ট্যাটাসের শুরুতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান এবং স্নাতক প্রোগ্রাম নিয়ে তাঁর ভাবনা তুলে ধরে বলেন:

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চার/পাঁচ প্রজন্ম মধ্যবিত্ত শ্রেণি উপহার দিয়েছে। এখন, ফেইজ বাই ফেইজ কিভাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অনার্স প্রোগ্রাম বন্ধ করে দেয়া যায়, সে নিয়ে ভাবতে হবে।”

তিনি আরও যোগ করেন:

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ও গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে। কেবল মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রাম থাকবে।”

তাঁর প্রস্তাবনা অনুযায়ী, দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এসেও শিক্ষার্থীরা ঢাবির অংশ হতে পারবেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন:

“দেশব্যাপী কন্সটিটুয়েন্ট কলেজগুলোতে পড়ে যেকেউ অনার্স করে ‘গর্বিত’ ঢাবিয়ান হতে পারবে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ থেকে অনার্স করে এসে মাস্টার্স বা পিএইচডি করেও ‘গর্বিত’ ঢাবিয়ান হওয়া যাবে।”

গবেষণার পুনর্গঠন ও দলীয় রাজনীতির অবসান

শিক্ষার গুণগত মান ও গবেষণার আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে মাহফুজ আলম বলেন:

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও সেন্টারগুলো পুনর্গঠন করতে হবে। গবেষক শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পাবেন এবং রাষ্ট্রের চাহিদা-ভবিষ্যত পরিকল্পনা মোতাবেক গবেষণা পরিচালিত হবে।”

তিনি বর্তমানের জাতীয়তাবাদ-ভিত্তিক ইতিহাস ও বাংলা চর্চার সমালোচনা করে বলেন:

“জাতীয়তাবাদের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইতিহাস ও বাংলা ভাষার উপর বিশেষ নজর দিয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষ সেটা राजनीतिक দালালির পর্যায়ে চলে গেছে। ভাষা শিক্ষাকে বিশেষায়িত করতে হবে এবং ইতিহাস চর্চার সাথে সমাজবিদ্যার যোগ ঘটাতে হবে। আধুনিক সমাজবিদ্যা ও বিজ্ঞানের উপর জোর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ক্ষেত্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।”

শিক্ষক-শিক্ষার্থী রাজনীতি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়ে লেখেন:

“শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ছাত্র রাজনীতি হবে ডাকসু নির্ভর। শিক্ষক ও গবেষণা সহকারী নিয়োগ করতে হবে মেধা ও পার্ফরমেন্সের ভিত্তিতে। বিদেশে ভালো ডিগ্রি-রেজাল্ট থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ না করার প্রচলন বন্ধ করতে হবে। অযোগ্য এবং দালাল শিক্ষকদের এ পবিত্র পেশা থেকে বিদায় করতে হবে।”

পুরান ঢাকাকে নিয়ে ‘হেরিটেজ সিটি’ ও আলাদা প্রশাসনিক ইউনিট

মাহফুজ আলমের প্রস্তাবনার আরেকটি অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিল পুরান ঢাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে নিয়ে একটি স্বাধীন প্রশাসনিক অঞ্চল গঠন। তিনি ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের রূপরেখা দিয়ে বলেন:

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, লালবাগ, হোসেনি দালান, কেন্দ্রীয় কারাগার সহ পুরান ঢাকার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোকে আলাদা প্রশাসনিক ইউনিটে/ কাঠামোতে নিয়ে আসতে হবে। এটাকে বিশ্ববিদ্যালয় ও হেরিটেজ সিটি ঘোষণা করতে হবে। এখানে আলাদা মেয়র নির্বাচন হবে। সংসদীয় আসন আলাদা করতে হবে।”

এই প্রস্তাবিত অঞ্চলের পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষা এবং এর ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ নিয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট নীতি উল্লেখ করে লেখেন:

“এ প্রস্তাবিত শহরে নতুন কোন ভবন হবে না। কোন গাছ কাটা যাবে না। কোন জলাশয় ভরাট করা যাবে না। এ শহর দীর্ঘমেয়াদে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে আহসান মঞ্জিল, ফরাশগঞ্জ, নর্থব্রুক হল সহ আরো হেরিটেজ সাইটগুলোকে সন্নিবেশ করবে। এখানে সন্নিবেশিত হবে কয়েকশ’ মুগল -ব্রিটিশ আমলের মসজিদ, মন্দির, উপাসনালয়, ভবন।”

স্ট্যাটাসের শেষে মাহফুজ আলম গভীর শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন:

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে এর প্রতিষ্ঠাতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সকল এলামনাই ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানাই।”

মাহফুজ আলমের এই যুগান্তকারী ও সাহসী প্রস্তাবনাটি ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমাজ-রাজনীতির বিভিন্ন মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *