ঈদুল আজহায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ, এক বছরে প্রাণহানি ১৬৯ থেকে ২১৯

গত বছরের তুলনায় এবারের ঈদুল আজহার ছুটিতে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছরের ঈদুল আজহার আগে-পরে ১১ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬৯ জন নিহত হলেও চলতি বছর একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ২১৯ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

শুধু প্রাণহানিই নয়, বেড়েছে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও আহতের সংখ্যাও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহন, পশুবাহী ট্রাকের চাপ, চালকদের ক্লান্তি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং বর্ষাকালীন প্রতিকূল পরিস্থিতি এ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

এক নজরে পরিসংখ্যান

সূচক২০২৫ (৪-১৪ জুন)২০২৬ (২৩ মে-২ জুন)
সড়ক দুর্ঘটনা১৫০টি১৮৬টি
নিহত১৬৯ জন২১৯ জন
আহত২৯৮ জন৩৭৭ জন

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে ৩৬টি, নিহত বেড়েছে ৫০ জন এবং আহত বেড়েছে ৭৯ জন।

ঈদে যাত্রীচাপ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন Road Safety Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, এবারের ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানী ঢাকা থেকে এক কোটির বেশি মানুষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করেছেন। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রায় চার কোটি মানুষের চলাচল হয়েছে।

সংগঠনটির হিসাবে, ২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত দেশে ২৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন নিহত হয়েছেন।

এ সময়ের বড় দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু বিশেষভাবে আলোচিত। এছাড়া দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েতে বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনের পেছনে ধাক্কা লেগে অন্তত ১৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

কেন বাড়ছে দুর্ঘটনা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। কারণ এ সময়ে যাত্রীবাহী বাসের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পশুবাহী ট্রাক ও পণ্যবাহী যান মহাসড়কে চলাচল করে।

এছাড়া—

  • সড়কের পাশে অস্থায়ী পশুর হাট
  • অতিরিক্ত যানজট
  • চালকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা
  • ফিটনেসবিহীন যানবাহনের ব্যবহার
  • বর্ষাকালীন প্রতিকূল আবহাওয়া

দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিরাপদ ঈদযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আহ্বান

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন তাদের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে,

“ঈদ উদযাপনকালে মাত্র চার-পাঁচ দিনের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষকে পরিবহন করার মতো মানসম্পন্ন ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা দেশে নেই।”

সংগঠনটির মতে,

“নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদি টেকসই ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।”

‘সড়ক নিরাপত্তা বছরজুড়ে নিশ্চিত করতে হবে’

বুয়েটের Dr. Hadiuzzaman বলেন,

“ঈদের সময় একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে আমরা সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় চর্চা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারছি না, সেখানে বিশেষ সময়ে রাতারাতি সবকিছু সুশৃঙ্খল হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।”

তিনি আরও বলেন,

“শুধু সরকারের নির্দেশনা বা হুঁশিয়ারিতে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়।”

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন,

“সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ২৪ ঘণ্টা, বছরের ৩৬৫ দিন নিয়মিত চর্চা করতে হবে।”

এছাড়া তিনি যোগ করেন,

“স্বাভাবিক সময়েই যদি ফিটনেসবিহীন, রুট পারমিটবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে রাখা যায় এবং আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে ঈদের মতো বিশেষ সময়ে অতিরিক্ত চাপ সামলানো অনেক সহজ হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল ঈদকেন্দ্রিক উদ্যোগ নয়, বরং বছরজুড়ে কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *