জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ে টেলিকম সেবা ঝুঁকিতে, জরুরি হস্তক্ষেপ চায় অ্যামটব

দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট ও তীব্র লোডশেডিংয়ের প্রভাবে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও টেলিযোগাযোগ সেবা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দিনে ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক এলাকায় জেনারেটরও সচল রাখা যাচ্ছে না।

এ পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর’ ও ‘ক্রমবর্ধমান’ সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছে অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)। সংস্থাটি জানিয়েছে, সরকারের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা বজায় রাখা সম্ভব নয়।

শনিবার এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছে অ্যামটব। চিঠিতে বলা হয়,

“পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকারের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ ছাড়া টেলিযোগাযোগসেবা চালু রাখা আর সম্ভব নয়।”

চিঠিতে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, বিপিসি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মোবাইল অপারেটরদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভার আহ্বান জানানো হয়েছে।

লোডশেডিং পরিস্থিতি

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী:

  • বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং: ১,৩০০ মেগাওয়াট
  • বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং: ১,৯২৩ মেগাওয়াট

জ্বালানি চাহিদা (বিটিএস চালাতে)

প্রতিদিন তিন প্রধান অপারেটরের মোট প্রয়োজন:

  • ডিজেল: ৫২,৪২৫ লিটার
  • অকটেন: ১৯,৮৫৯ লিটার

অপারেটরভিত্তিক চাহিদা:

  • গ্রামীণফোন:
    • ডিজেল: ২৮,০৭৯ লিটার
    • অকটেন: ৯,২৫৪ লিটার
  • রবি আজিয়াটা:
    • ডিজেল: ১৩,১৪০ লিটার
    • অকটেন: ৫,৬১০ লিটার
  • বাংলালিংক:
    • ডিজেল: ১১,২০৬ লিটার
    • অকটেন: ৪,৯৯৫ লিটার

ডেটা সেন্টার পরিচালনা ব্যয়

  • প্রতি ঘণ্টায় ডিজেল লাগে: ৫০০-৬০০ লিটার
  • দৈনিক প্রয়োজন (একটি ডেটা সেন্টার): প্রায় ৪,০০০ লিটার

অপারেটরদের মোট দৈনিক ডিজেল প্রয়োজন:

  • মোট: ২৭,১৯৬ লিটার
    • গ্রামীণফোন: ১১,১৮৪ লিটার
    • রবি: ৯,৭৩২ লিটার
    • বাংলালিংক: ৮,২০০ লিটার

অপারেটরদের উদ্বেগ

রবি আজিয়াটার কর্মকর্তা সাহেদ আলম বলেন:

“জ্বালানি সংকটের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনা বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।”

“দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং মোকাবেলায় জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।”

“জ্বালানি সরবরাহে অনিয়ম ও পরিবহন জটিলতা নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন:

“এ অবস্থার উন্নতি না হলে নেটওয়ার্কের মান কমে যাওয়া বা সাময়িক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি রয়েছে।”

গ্রামীণফোনের কর্মকর্তা তানভীর মোহাম্মদ বলেন:

“বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন টেলিকমসেবা বজায় রাখতে সময়োপযোগী ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন।”

“ডেটা সেন্টার ও বেস স্টেশনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।”

বাংলালিংকের কর্মকর্তা তৈমুর রহমান বলেন:

“টেলিযোগাযোগকে অগ্রাধিকারমূলক পরিষেবা হিসেবে গণ্য করতে হবে।”

“নেটওয়ার্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিশ্চিত বিদ্যুৎ ও সহজলভ্য জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য।”

সম্ভাব্য ঝুঁকি

অ্যামটব সতর্ক করে বলেছে:

  • মোবাইল নেটওয়ার্ক আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে
  • কল, ইন্টারনেট, এসএমএস সেবা বন্ধ বা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে
  • ওটিপি, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হবে
  • জরুরি সেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে

অ্যামটব মহাসচিব বলেন:

“ডেটা সেন্টারই নেটওয়ার্কের মস্তিষ্ক—এটা বন্ধ মানে পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়া।”

ব্যবহারকারীর পরিসংখ্যান

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী:

  • মোট মোবাইল ব্যবহারকারী: ১৮ কোটি ৫৮ লাখ ৪০ হাজার
  • মোবাইল ব্যবহার করে: ৮৮.৪% মানুষ
  • নিজস্ব মোবাইল রয়েছে: ৬৪.৪% মানুষের
  • মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী: প্রায় ১১ কোটি

সরকারের প্রতিক্রিয়া

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী জানান:

“টেলিকমিউনিকেশন একটি জরুরি সেবা হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।”

“সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে অবহিত করা হয়েছে এবং সমন্বয় জোরদারের কাজ চলছে।”

তিনি আরও বলেন:

“মোবাইল নেটওয়ার্ক যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সব পক্ষ কাজ করছে।”

জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ লোডশেডিং এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতায় দেশের টেলিযোগাযোগ খাত বর্তমানে চরম চাপে রয়েছে। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে দেশব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *