সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দুই দফায় পিটিয়ে হত্যা, স্বজনদের দাবি নিহত ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্যহীন

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে দুই দফায় পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, তিনি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছেন। তবে নিহতের স্বজনেরা জানিয়েছেন, তিনি বেশ কিছু দিন ধরে মারাত্মক মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ও রাতে পৃথক দুই স্থানে এই হামলার ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গতকাল সন্ধ্যার আগে দেবহাটার কুলিয়া এলাকায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে প্রথম দফায় মারধর করে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা। খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এরপর রাত ৯টার দিকে মিছিল নিয়ে কয়েক শ লোক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঢুকে তাকে আবারও মারধর করে। পরে গভীর রাতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম দেবহাটা উপজেলার বড় শান্তা গ্রামের মৃত শামছুর রহমানের ছেলে। তিনি মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।

ঘটনার বিবরণে স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তি ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ করেন এবং স্থানীয়দের জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর কুলিয়া এলাকায় এক গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে উত্তেজিত জনতা জড়ো হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকা শামীমকে টেনে বের করে প্রথম দফায় প্রহার করে।

ঘটনা নিয়ে ফজলুল হক আমিনী বলেন, “শামীম গত ছয় মাস ধরে আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে আসছিলেন। তৌহিদী জনতা তাকে গণপিটুনি দিয়েছে।”

অন্যদিকে নিহতের ছোট ভাই সাগর হোসেন বলেন, পারিবারিক সমস্যার কারণে তার ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং তার চিকিৎসা চলছিল। তিনি বলেন, “দুই দিন আগে স্ত্রীর সঙ্গে ভাইয়ের ঝগড়া হয়। সেই সময় তাদের কথাবার্তা কেউ রেকর্ড করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয় বলে ধারণা করছি। ঝগড়ার পর শামীম বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তাকে গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে টেনে বের করে প্রথম দফায় এবং পরে হাসপাতালে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় মারধর করে তাকে মেরে ফেলা হলো। তিনি কোনো অপরাধ করে থাকলে আইনের মাধ্যমে বিচার হতে পারত।”

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, ৯৯৯-এ কল পেয়ে সন্ধ্যায় শামীমকে উদ্ধার করে উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাত ৯টার দিকে শত শত মানুষের একটি মব হাসপাতালে গিয়ে তাকে আবার মারধর করে। পুলিশ পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা সটে পড়ে। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।

আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও একাধিক ‘মব জাস্টিস’ বা জনরোষের নির্মম ঘটনা ঘটেছিল, যা নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। তখন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশা প্রকাশ করেছিল যে, একটি রাজনৈতিক ও নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে প্রশাসন আরও তৎপর হবে এবং বিচারবহির্ভূত এসব অপরাধ কঠোর হস্তে দমন করা সম্ভব হবে।

তবে বর্তমান বিএনপি সরকারের মেয়াদেও সাতক্ষীরার মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় হাসপাতালে ঢুকে রোগীকে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা সামনে আসায় নাগরিক সমাজের মনে প্রশ্ন উঠছে—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কি সত্যি কোনো পরিবর্তন এসেছে? নাকি ‘মব জাস্টিস’-এর এই সংক্রামক সংস্কৃতি এখনো বেপরোয়া অবস্থায় রয়ে গেছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *