রহমতের রোজার জবানে ‘ মুক্তিযুদ্ধ ‘

A black and white historical photograph of Bangladeshi freedom fighters (Mukti Bahini) preparing food in a rural camp during the 1971 Liberation War, with a portrait overlay of writer Siam Al Zaki.

সিয়াম আল জাকি
প্রাবন্ধিক

বাঙালি জাতীয়তাবাদ কলকাতার বিখ্যাত বেঙ্গল রেনেসাঁসের ফল কীনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বেঙ্গল রেনেসাঁসের বিভিন্ন লেখক মোটাদাগে ইসলাম বিদ্বেষী ছিলেন। এমনকি বিভিন্ন লেখক দাবী করেন বাংলাতে মূলত আধুনিক যুগ শুরু হয়েছে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পরাজিত হওয়ার মাধ্যমে।  যদুনাথ সরকারের মতো প্রখ্যাত ইতিহাসবিদরাও এক সময় দাবি করেছিলেন যে, ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমেই বাংলার মধ্যযুগের অবসান এবং আধুনিক যুগের সূচনা। বলাবাহুল্য

রেনেসাঁস ছিল মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দু ও কলকাতার উচ্চবিত্ত কেন্দ্রিক।  এতে বাংলার বিশাল অংশ যাঁরা কৃষক ও মুসলিম তাঁদের অংশগ্রহণ বা প্রতিফলন খুব কম ছিল। ফলে যে জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছিল, তা ছিল একপেশে। এই একপেশে বয়ানে লালিত অনেক লেখকই পরে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস নির্মাণ করেছে৷  এবং ঐ রেনেসাঁসের তারা যেহেতু আদর্শিক পুত্র ছিলো তাই  তাদের মুক্তি যুদ্ধের বয়ানে ‘ইসলাম’ এবং এর আনুষাঙ্গিক কিছুটা নেতিবাচক এবং প্রায় না ভূমিকাতে ছিলো।

তাই, এই লেখার উদ্দেশ্য মুক্তি যুদ্ধে রোজার হালচাল কেমন ছিল তা পরখ করে ইতিহাসকে একটু বিচিত্র দৃশ্য দেওয়া। একটা সতর্ক বাণী দিয়ে রাখি এখানের রেফারেন্স হিসেবে নেওয়া লেখকগণের জীবনচরিতও লেখার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে না মিলতে পারে কিন্তু এই লেখকের কারণে তাদের লেখা নিবন্ধের  লেখার উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ হয়েছে।

এক.

মুক্তি যুদ্ধের সময়কার রোজা নিয়ে আলাপ আছে হুমায়ূন আহমেদের একটা ছোট্ট লেখায়। লেখার নাম ” হোটেল আহমেদিয়া ” হুমায়ূনের লীলাবতীর মৃত্যু বইটাতে আছে। যদিও ওটা রোজা নিয়ে না, হুমায়ূনের মুক্তি যুদ্ধের সময়কার জীবন নিয়ে, রোজার আলাপ আসে প্রসঙ্গক্রমে।

অনেকেই জানেন বা জানেন না যে হুমায়ূনের নানা একজন রাজাকার ছিলেন। হুমায়ূন তার নানার রাজাকার হবার ঘটনা ব্যাখ্যা করেন এইভাবে যে,  — “

আমার বাবাকে পাকিস্তানি মিলিটারি গুলি করে হত্যা করেছে। নানাজান আমাদের  সুদূর বরিশালের গ্রাম থেকে উদ্ধার করে নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন। তা ও একদফায় পারেন নি। কাজটি করতে হয়েছে দুবারে। তার অনুপস্থিতিতেই তাকে শান্তি কমিটির সভাপতি করা হলো। তিনি না বলতে পারলেন না। না বলা মানেই আমাদের দু ‘ ভাইয়ের জীবন সংশয় “.

এখানে উল্লেখ্য ততোদিনে হুমায়ূনের বাবা মুক্তি যুদ্ধে শহীদ। শহীদের পরিবারকে বাঁচাতে হুমায়ূনের নানা হয়েছেন রাজাকার / শান্তি কমিটি প্রধাণ। মুক্তি যুদ্ধ আসলেই বৈচিত্র্যময় আয়োজন কিন্তু!

তা যাইই হোক হুমায়ূন বলেন তার নানাকে ঠিক পাকিস্তানিরা ভরসা করতো না। এজন্য বারংবার রাতে হানা দিতো তাদের ঘরে। একদিন হুমায়ূনদের পরিবার সমেত দেখে পাকিস্তানি মিলিটারিরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যেতে বলে তাকে। অন্তত পড়ে এমনটাই মনে হয়।

রোজার কিঞ্চিৎ আলাপ আসে এখানে। হুমায়ূনের স্মৃতিতে তৎকালীন ঢাবি হল অনেক নিরাপদ। কারণ ধরেই নেওয়া হচ্ছে মুক্তি যুদ্ধের সময় যারা হলে তারা নিশ্চয়ই পাকিস্তানের সমর্থক তাই!  আর হুমায়ূনও তার পলাতক জীবন নিয়ে কষ্টে ছিলেন।

হুমায়ূন লেখেন,  — ” মিলিটারি এসে ধরে নিয়ে মেরে ফেলবে এই সার্বক্ষণিক ভয়ের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি, যার আনন্দ কম নয়। কষ্ট একটাই খাওয়ার কষ্ট। রোজার সময় বলেই সব দোকান বন্ধ। হোটেল তো বন্ধ চায়ের দোকানও বন্ধ। হলের মেসও বন্ধ। ধর্মীয় কারণে নয় নিতন্ত্র বাধ্য হয়েই হলের অনেকেই রোজা রাখছে । সেখানেও বিপদ আছে। বিকেলে ইফতারি কিনতে নিউমার্কেট গিয়ে একজন মিলিশিয়ার বেধড়ক মার খেল। মিলিশিয়ার বক্তব্য, রোজার দিনে এই ছাত্র  নাকি ছোলা ভাজা খাচ্ছিলো। “

দেখা যাচ্ছে তৎকালীন ঢাকার রোজার সামাজিক প্রেক্ষাপট কঠোর সামাজিক পুলিশিং এবং নিয়ন্ত্রণ মূলক আচারে আবদ্ধ। রহমতের ছোয়া  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেইসব রুহে অন্তত পৌঁছায় নি। আজ বাংলাদেশের এক আমীরও দেখলাম একই ফরমানজারির পক্ষে আছেন। ঐতিহাসিক অবস্থান একই ধরণের মানসিকতার শেকড় উন্মুক্ত করে কীনা তা কে জানে!

দুই.

লেখক জাহানারা ইমাম শহীদ জননী হিসেবে বিখ্যাত। তার লেখা দিনলিপি স্মৃতিকথার এক ভালো নিদর্শন বটে একাত্তরের জন্য। জাহানারা ইমামের  ভক্ত এবং তাকে পছন্দ না করা এমন ব্যক্তির মাঝে চিরজীবী এক চরিত্র। এমনকি ৯/১১ এর পরবর্তী যে বৈশ্বিক ইসলামোফোবিয়ার রাজনীতির ছটা বাংলাদেশেও নতুন করে এসে পড়েছিলো তাতে তাকে এবং তার  গঠন করা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিকে দোষী হিসেবেও কেউ কেউ ঠাউর করেন।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে একাত্তরের স্মৃতিকথায় তিনি তার প্রতি এহেন অভিযোগের সু্বিচার করেন নি।

সত্যি বলতে একাত্তরের ৯ মাস ঢাকা কার্যত অবরুদ্ধ ছিল। রমজান মাসেও এমন  পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি। যদিও একশ্রেণির মানুষের ওপর চেপে বসেছিল ঈদের কেনাকাটার ভূত। কিন্তু হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণের ফলে সেই ভূত পালিয়ে যায়।

 জাহানারা ইমাম তাঁর একাত্তরের দিনগুলিতে ঢাকায় ঈদের কেনাকাটার বিবরণ তুলে ধরে লিখেছেন, ‘গতকাল বায়তুল মোকাররমের দোকানে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। আজকাল ঢাকায় এ রকম কোথাও কিছু হলে আমার বিস্তারিত খবর জানতে কোনো অসুবিধা হয় না…। দোকানের সামনে দাঁড়ানো তিনজন খানসেনা মরেছে, আরও কয়েকজন জখম হয়েছে। ফল হয়েছে বাকি দিন দোকানপাট সব বন্ধ। লোকের ঈদের কেনাকাটায় ছাই পড়েছে। বেশ হয়েছে।’ ।’

তিন.

সাহিত্যিক আবুল ফজল তাঁর দুর্দিনের দিনলিপিতে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘তারা কোনো দোষ করেনি, করেনি কারও কোনো ক্ষতি। কেউ নিয়মমাফিক অফিস করে, কেউ–বা বেচাকেনা করে, কেউ হয়তো আসন্ন ঈদের সওদা করে বাড়ি ফিরছে, অনেকেই রোজাদার, অতর্কিতে তাদের ওপরই কিনা নেমে এসেছে ছোরাছুরির মুখে এক অভাবনীয় মৃত্যু। কয়েক দিন ধরে চলেছে এ পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড।’

পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী যে রোজাদারদেরও ছাড়েনি হত্যা করার সময় এটাই প্রমাণ করে ঐ ঘুনে ধরা মিলিটারি পোশাকে অন্তত ইসলাম রক্ষা করার নৈতিক ভিত্তি ছিলো না ।

এর আরেক প্রমাণ কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার সম্পাদিত ১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সংকলনে উঠে আসে বগুড়ার পীরবাড়িতে রমজান মাসে ঘটে যাওয়া বর্বরতার দুঃসহ স্মৃতি। প্রত্যক্ষদর্শী মো. তবিবুর রহমান, আবদুল হান্নান ও রহিমুদ্দিন ফকিরের ভাষ্য অনুযায়ী,‘২৩ রমজান (১৩ নভেম্বর, ১৯৭১) পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা সাহ্‌রির সময় পীরবাড়ি ও তার আশপাশের এলাকা ঘেরাও করে। বাড়ির মোট ৭ জন পুরুষ সদস্য ও গ্রামের অন্য পাড়ার যাকে যেখান থেকে ধরতে পেরেছে এমন ৪ জন, মোট ১১ জনকে পুকুরপাড়ে সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ওই ১১ জন শহীদের মধ্যে ১৪ বছর বয়স্ক ৭ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত একজন কিশোর থেকে শুরু করে ৬৮ বছর বয়স্ক একজন অসুস্থ বৃদ্ধ লোক পর্যন্ত ছিলেন। উল্লেখ্য, এদের সবাইকে ধরা হয়েছিল সেহরি খাওয়ার সময়। কেউ সেহরি শেষ করেছেন, আবার কাউকে তার অর্ধসমাপ্ত সেহরি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। শুধু তা–ই নয়, একজন ফজরের নামাজ পড়ার সময় চেয়েছিলেন কিন্তু পাকিস্তান ও ইসলামের রক্ষাকারী খাঁটি মুসলমানেরা তাঁদের সে সময় দেয়নি।’

৪.

রমজানের যুদ্ধ এবং এরমধ্যেই দরদের রহমত খুজতে চাওয়ার নজির আছে বেশকিছু।

 এই যেমন,  একাত্তরের রমজান মাসে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে সফল অভিযান চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে ধরাশায়ী করেন গেরিলা কমান্ডার মাহবুব আলম। ২১ রমজান (১১ নভেম্বর, ১৯৭১) তাঁদের অভিযানের জন্য নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানোর পরপরই ঘনিয়ে আসে ইফতারের সময়। এমন সময় এক হুজুর তাঁদের জন্য ইফতারের আয়োজন করেন। মাহবুব আলম তাঁর গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে (দ্বিতীয় খণ্ড) বইয়ে সেই ইফতারের স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন, ‘সোনারবান পৌঁছে যাই সন্ধ্যার মাগরেবের নামাজের সময়, রোজার ইফতারের সময় তখন। হুজুর ইফতারি নিয়ে বসেছেন। আমাদের দেখেই তিনি উঠে দাঁড়ান এবং ইফতারি জোগাড়যন্তর করার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। হুজুরকে বলি, ৪–৫ জন ছাড়া কেউই রোজা নেই। তিনি বলেন, তাতে কী হয়েছে, রোজার দিনে ইফতার করা তো সওয়াবের কাজ। এরপর তাঁর ঘরের সামনে লম্বা করে মাদুর বিছিয়ে তিনি সবার আয়োজন করেন। সবার জন্য ইফতারের প্লেট আসে। মুড়ি-চিড়া-গুড়সহযোগে সামান্য আয়োজন। কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে গভীর আন্তরিকতার ছোঁয়া। মসজিদে আজান হয়। হুজুর বলেন, “নেন বিসমিল্লাহ্ করেন।” আমরা সবাই হাত লাগাই প্লেটে। রমজান মাসের দিন শেষের এই শান্ত সমাহিত ক্ষণ একটা পরম পবিত্র লগ্ন হিসেবেই সবার কাছে ধরা দেয়।’

এমনকি যেদিন কোনো অভিযান থাকবে না, সেদিন সবাই রোজা রাখবেন এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের রোজা রাখার এই প্রবণতা নিয়ে মাহবুব আলমের উপলব্ধি হলো, ‘জন্ম থেকে বয়ে নিয়ে আসা ধর্মীয় অনুভূতি আর বিশ্বাস কি ঝট করে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া যায়? মুক্তিযুদ্ধ বা জয় বাংলার জন্য যে সংগ্রাম, তা তো আর ধর্মহীন হবার বা তার বিরুদ্ধে যাবার মতো কোনো ব্যাপার নয়। যার যা ধর্ম, সে সেটা পালন করুক। ছেলেদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা অনুভূতি আমাদের যুদ্ধে বা সংগ্রামে কোনোই বিরূপ প্রভাব ফেলছে না।’

এভাবেই মুক্তিযুদ্ধ  রহমতের সঙ্গে সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশই ছিলো।

৫.

এতো আলোচনার ভিত্তিতে বুঝতে পারা যায় যে ঈদ মুক্তি যুদ্ধের সময় একটু শংকা নিয়েই এসেছিলো।

১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর, ঈদের আগের দিন ছিল পবিত্র জুমাতুল বিদা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। তিনি তাঁর একাত্তরের ডায়েরিতে জুমাতুল বিদার দিন নিয়ে লিখেছেন, ‘শুক্রবার, ১৯ নভেম্বর। আজ সকালে কিছুক্ষণ বসে প্রশ্নপত্র তৈরি করলাম কিছুটা। ১২.৩০টায় বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গেলাম। আজ জুমাতুল বিদা। দোয়া করা হলো। আজ রোজা রাখলাম। বিকেলে বোমার শব্দ। আজ আমরা আর কোথাও গেলাম না। কাল নাকি ঈদ হবে।’ ‘কাল নাকি ঈদ হবে’—মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর এই বাক্যের ব্যবহারই জানান দেয়, তখনকার আবহাওয়া ছিল কতটা সঙিন।


সম্পাদকীয় নোট

এই নিবন্ধটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, ডায়েরি এবং প্রকাশিত সংবাদ নিবন্ধের সংকলিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে । লেখায় ব্যবহৃত তথ্যগুলো কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ , শহীদ জননী জাহানারা ইমাম , সাহিত্যিক আবুল ফজল এবং গেরিলা কমান্ডার মাহবুব আলমের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিচারণ থেকে নেওয়া। পাঠকদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের একটি ভিন্নতর মানবিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট তুলে ধরাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *