১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন ভারত ও বাংলাদেশ গঙ্গার পানি ভাগাভাগির চুক্তি সই করেছিল, তখন সেটাকে মনে হয়েছিল একটা নতুন ভোর। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা বিরোধ, কূটনৈতিক টানাপোড়েন আর পানির জন্য লড়াই — সবকিছুর একটা সমাধান হলো অবশেষে। ৩০ বছরের জন্য। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত
সেই ডিসেম্বর এখন মাত্র কয়েক মাস দূরে।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নবায়নের কোনো চূড়ান্ত আলোচনা এখনো হয়নি। আর বাংলাদেশ — যে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন কোটিরও বেশি মানুষের জীবন পদ্মার পানির উপর নির্ভরশীল — এখন নিজেই নিজের পানি নিজে ধরে রাখার পথে হাঁটছে।
ফারাক্কা থেকে শুরু — যে বাঁধ সব বদলে দিয়েছিল
গল্পটা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে।
ভারত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল হুগলি নদীতে পানি সরিয়ে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা ঠিক রাখা। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের মাশুল দিতে হলো ভাটির দেশ বাংলাদেশকে।
ফারাক্কা চালু হওয়ার পর থেকে পদ্মার প্রবাহ কমতে শুরু করে। শুকনো মৌসুমে — জানুয়ারি থেকে মে — পানির প্রবাহ এতটাই কমে যায় যে রাজশাহী, কুষ্টিয়া, পাবনা, খুলনা, বরিশাল অঞ্চলের কৃষক, জেলে, নৌকার মাঝি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকেন। পদ্মা-নির্ভর গড়াই, মধুমতি, মাথাভাঙা নদীগুলোও শুকিয়ে যেতে শুরু করে। সুন্দরবনে লবণাক্ততা বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশ প্রতিবাদ করেছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বলেছে। কিন্তু ভারত একতরফা এই বাঁধ চালু রেখেছে। ১৯৭৭, ১৯৮২ এবং ১৯৮৫ সালে কিছু সাময়িক চুক্তি হয়েছিল — কিন্তু কোনোটাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছিল না।
অবশেষে ১৯৯৬ সালে আসে সেই চুক্তি।
১৯৯৬ সালের চুক্তি: আশা ও সীমাবদ্ধতা
১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবেগৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তিতে সই করেন। ৩০ বছরের এই চুক্তি নির্ধারণ করে প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত — অর্থাৎ শুকনো মৌসুমে — ফারাক্কায় পানির প্রবাহ দুই দেশের মধ্যে কীভাবে ভাগ হবে।
সূত্রটা ছিল এরকম: যদি ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০,০০০ কিউসেকের কাছাকাছি থাকে, তাহলে ৫০-৫০ ভাগ। প্রবাহ কম হলে বাংলাদেশ পাবে কমপক্ষে ৩৫,০০০ কিউসেক। প্রতি দশ দিন পরপর পরিমাপ করে হিসাব করা হবে।
সেই সময়ের বিবেচনায় চুক্তিটি ছিল একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
বাংলাদেশ বারবার অভিযোগ করেছে — চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য পানি পুরোটা পায়নি। শুকনো মৌসুমে পানি আসে কম, বর্ষায় আসে হঠাৎ বিপুল পরিমাণে — উজানে বাঁধ খুলে দিলে। এই “ইয়ো-ইয়ো প্রভাব” এর ফলে শীতে ফসল মারা যায় খরায়, গ্রীষ্মে তলিয়ে যায় বন্যায়।
চুক্তির আরেকটা বড় সীমাবদ্ধতা হলো — এটি ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের ঐতিহাসিক প্রবাহের তথ্যের উপর নির্মিত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ গলছে, বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে — ১৯৯৬ সালের হিসাব দিয়ে ২০২৬ সালের নদী মাপা যায় না।
এবং গঙ্গার উপর ভারতে এখন প্রায় ৯৪০টি বাঁধ ও ব্যারাজ আছে। চুক্তিতে বলা ছিল, বাংলাদেশকে না জানিয়ে নতুন কোনো স্থাপনা করা যাবে না — কিন্তু এই শর্ত কতটা মানা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
ডিসেম্বর ২০২৬: কী হবে চুক্তির?
ভারত ও বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু করেছে — যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে গঙ্গা ও পদ্মার পানির স্তর পরিমাপ করা হচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন পর্যন্ত কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই।
এর কারণ একাধিক।
প্রথমত, রাজনৈতিক পরিবর্তন। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়। নতুন বিএনপি সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক এখনো জমে ওঠেনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে — যা ভারত ভালো চোখে দেখছে না।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। গঙ্গার পানি ভাগের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের সম্মতি দরকার — কারণ পানি ভারতের সংবিধানে রাজ্যের বিষয়। সদ্য নির্বাচিত বিজেপি সরকার কী অবস্থান নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এক হলেও, উত্তরবঙ্গের কৃষকদের পানির দাবি তাদের নিজস্ব চাপ তৈরি করে।
তৃতীয়ত, তিস্তার ছায়া। বাংলাদেশ তিস্তা প্রকল্পে চীনকে ডেকেছে, পদ্মা ব্যারাজেও চীনের অর্থায়নের কথা ভাবা হচ্ছে — এই প্রেক্ষাপটে ভারত কতটা আন্তরিকভাবে গঙ্গা চুক্তি নবায়নে এগোবে, সেটা বড় প্রশ্ন।
পদ্মা ব্যারাজ: ৬০ বছরের স্বপ্ন এখন বাস্তবতার মুখে
ভারতের মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে, নিজেদের পানি নিজেরা ধরে রাখার পরিকল্পনা করছে। এর নাম পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প — এবং এই ধারণাটি নতুন নয়, বরং প্রায় ৬০ বছরের পুরনো।
১৯৬৩ সালে নিউইয়র্কের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তৎকালীন পাকিস্তান সরকারকে ফারাক্কার বিপরীতে পদ্মায় একটি ব্যারাজ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ২০০০ সালের মধ্যে আরও তিনটি সমীক্ষা হয়েছে। ২০০৯ সালে হাসিনা সরকার রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করে, যা ২০১৩ সালে সম্পন্ন হয়।
কিন্তু প্রতিবারই প্রকল্পটি থামে। কখনো ভারতের আপত্তিতে, কখনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতায়। ২০১৭ সালে শেখ হাসিনা দিল্লি সফর থেকে ফিরে এই প্রকল্পকে “ত্রুটিপূর্ণ ও আত্মঘাতী” বলে বাতিল করে দেন — ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়, ভারতের চাপেই এই সিদ্ধান্ত।
এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের পূর্ণ প্রস্তাব তৈরি করেছে। মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০,৪৪৩ কোটি টাকা — দুটি পর্যায়ে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা। প্রথম পর্যায়ে ৩৪,৬০৮ কোটি টাকায় মূল ব্যারাজ কাঠামো এবং হিসনা-মাথাভাঙা ও গড়াই-মধুমতি নদী পুনর্খনন করা হবে। রাজবাড়ীর পাংশায় ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কাঠামোতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডারস্লুইস গেট, নৌচলাচলের জন্য লক, দুটি মাছের পথ এবং একটি রেলওয়ে সেতু। উৎপন্ন হবে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ।
সরকার প্রথমে নিজস্ব অর্থায়নে কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরে বিদেশি ঋণ — চীন সহ — নেওয়া হতে পারে।
পদ্মা ব্যারাজে কী পাবে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ পদ্মার পানির উপর নির্ভরশীল। এই এলাকায় বাস করেন দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ — প্রায় ৬ কোটি। ব্যারাজ হলে:
- বর্ষার পানি ধরে রেখে শুকনো মৌসুমে প্রতি সেকেন্ডে কমপক্ষে ৫৭০ কিউবিক মিটার পানি ছাড়া যাবে — মরে যাওয়া নদীগুলো আবার বাঁচবে।
- প্রায় ১৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ নিশ্চিত হবে।
- বছরে অতিরিক্ত ২৩.৯ লক্ষ টন চাল এবং ২৩.৪ লক্ষ টন মাছ উৎপাদন সম্ভব।
- দক্ষিণ-পশ্চিমে লবণাক্ততা কমবে, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা পাবে।
- রাজশাহী, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা সহ ২৬টি জেলার ১ কোটি ৯০ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমিতে প্রভাব পড়বে।
- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক আভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ১৭ শতাংশ, এবং বার্ষিক আর্থিক সুবিধা প্রায় ৭৩,৬০০ কোটি টাকা বলে প্রকল্পের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত কেন উদ্বিগ্ন?
পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে ভারতের আপত্তি নতুন নয়।
ভারতের মূল উদ্বেগ হলো — বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বড় পানিসংরক্ষণ কাঠামো হলে বর্ষা মৌসুমে বাড়তি পানি ভারতে উল্টো প্রবাহিত হতে পারে। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কিন্তু বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুক্তি দুর্বল। ব্যারাজের নকশাই এমন যে বর্ষায় পানি ধরে রাখা হবে, মৌসুমের বাইরে ছাড়া হবে — ভারতে উপচে পড়ার প্রশ্ন নেই।
সত্যিকার কারণটা হয়তো ভিন্ন। বাংলাদেশ যদি নিজেই পানি ব্যবস্থাপনায় স্বনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে ভারতের কাছে পানি নিয়ে দর কষাকষির সুযোগ কমে যায়। পানি এখন পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা বড় লিভারেজ।
বাংলাদেশ আসলে কী চাইছে?
চুক্তি নবায়ন করতে হবে — কিন্তু পুরনো ফর্মুলায় নয়। বাংলাদেশ চাইছে:
১. আপডেটেড হাইড্রোলজিক্যাল তথ্যের ভিত্তিতে নতুন বণ্টন সূত্র — ১৯৪৯-৮৮ সালের তথ্য দিয়ে ২০২৬ সালের নদী মাপা হবে না।
২. রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা — শুধু ভারত নয়, দুই দেশের যৌথ পরিমাপ।
৩. উজানে নতুন অবকাঠামো হলে আগাম জানানোর বাধ্যবাধকতা — আন্তর্জাতিক পানি আইনে এটা স্বীকৃত নীতি।
৪. জলবায়ু পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে পরিবেশবান্ধব ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চয়তা।
৫. দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি — যাতে পরবর্তী প্রজন্মকে একই লড়াই করতে না হয়।
কিন্তু ভারতের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশ এখন নিজের বিকল্পও তৈরি করছে। পদ্মা ব্যারাজ তারই প্রমাণ। তিস্তায় যেমন চীনকে ডাকা হয়েছে, পদ্মা ব্যারাজেও পরবর্তী পর্যায়ে চীনের অর্থায়ন আসতে পারে।
দ্যা বিগ পিকচার
গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া শুধু একটা কাগজের চুক্তির বিষয় নয়।
এটা বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তার ভিত্তি। কোটি কোটি মানুষের কৃষি, মৎস্য, পানীয় জল, নৌচলাচল — সব এই একটা নদীর উপর নির্ভর করে। চুক্তি না হলে, বা দুর্বল শর্তে হলে, ভারত যেকোনো শুকনো মৌসুমে পানি কমিয়ে দিতে পারবে — আর বাংলাদেশের কাছে কার্যকর কোনো আইনি রক্ষাকবচ থাকবে না।
একই সময়ে তিস্তা প্রকল্পে চীন, পদ্মা ব্যারাজে সম্ভাব্য চীনা অর্থায়ন — এই সমীকরণ ভারতকে যেমন অস্বস্তিতে ফেলছে, তেমনি বাংলাদেশের জন্য এটা একটা কৌশলগত সুযোগও।
বাংলাদেশ এবার আর শুধু অনুরোধ করছে না। বিকল্প তৈরি করছে। নিজের নদীর পানি নিজে ধরে রাখার পথ খুঁজছে।
৩০ বছর আগে একটা চুক্তি দিয়ে সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা হয়েছিল। সেটা অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। এবার বাংলাদেশ শুধু চুক্তির উপর নির্ভর না করে, মাটির উপর কাজ করতে চাইছে।
সময় বলবে, এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়।
এই প্রতিবেদনটি ডেইলি স্টার, ট্রিবিউন, টিবিএস নিউজ, দ্য ডিপ্লোম্যাট এবং ডাউন টু আর্থ-সহ একাধিক সূত্র থেকে সংকলিত বিশ্লেষণধর্মী ব্রেকডাউন।
