ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ানের মতোই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মুকুট রক্ষার অভিযান শুরু করল আর্জেন্টিনা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ‘জে’ গ্রুপের হাইভোল্টেজ ম্যাচে উত্তর আফ্রিকার শক্তিশালী দল আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। স্কোরলাইন হয়তো একটি সুশৃঙ্খল ও একপেশে জয়ের গল্প বলছে, কিন্তু কানসাস সিটি স্টেডিয়ামের এই রাতটি আসলে কোনো সাধারণ ফুটবল ম্যাচের গল্প নয়। এই রাতটি ছিল এক চিরসবুজ জাদুকরের অমরত্বের আলোয় নিজেকে নতুন করে চেনানোর রাত।
৩৮ বছর বয়সে এসেও লিওনেল মেসি প্রমাণ করলেন, সময় তার পায়ে এসে থমকে দাঁড়ায়। ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগকে একাই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তুলে নিলেন নিজের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক। আর এই অবিস্মরণীয় কীর্তির মাধ্যমে জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসাকে স্পর্শ করে যৌথভাবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৬ গোল) হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন তিনি।
পিচের ক্যানভাসে মেসির পায়ের কবিতা
ফুটবল মাঠে লিওনেল মেসিকে দেখা মানে কোনো দক্ষ কবির কবিতা পড়া, যিনি যুগের পর যুগ ধরে লিখে চললেও যার শব্দের ক্ষুরধার ধার একটুও কমেনি। যেখানে তরুণ ফুটবলাররা গতির ঝড়ে মরিয়া হয়ে ছোটেন, সেখানে মেসি চলেন এক অদ্ভুত শান্ত ও মায়াবী ছন্দে—যেন তিনি আগে থেকেই জানেন এই গল্পের শেষ দৃশ্যটা কেমন হবে।
ম্যাচের ১৭ মিনিটে তার প্রথম গোলটি ছিল এক নিখুঁত জ্যামিতিক শিল্প। দূর থেকে নেওয়া এক জাদুকরি শটে আলজেরিয়ার রক্ষণকে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়ান তিনি। দ্বিতীয় গোলটিতে ছিল তাঁর সহজাত ফুটবলীয় প্রজ্ঞা ও অবিশ্বাস্য রিফ্লেক্স। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের বুলেট গতির শট গোলরক্ষক লুকা জিদান ফিরিয়ে দিলে ফিরতি বলে ডান পায়ের টোকায় ব্যবধান দ্বিগুণ করেন কাপ্তান। কিন্তু ম্যাচের ৭৬ মিনিটে আসা হ্যাটট্রিক পূর্ণ করা তৃতীয় গোলটি ছিল ফুটবল বিধাতার নিজের হাতে লেখা এক ট্র্যাজেডি। নিকো গঞ্জালেসের পাস থেকে বল পেয়ে বক্সের কোণ থেকে বাম পায়ের যে নিচু শটে আলজেরিয়ার জাল কাঁপালেন, তা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি গোল করেননি, বরং ফুটবল নামক খেলাটির পায়ে আরও একটি অর্ঘ্য নিবেদন করলেন। মুহূর্তেই গ্যালারির হাজার হাজার দর্শক দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানান এই মহানায়ককে।
ম্যাচ বিশ্লেষণ: স্কালোনির ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস
ম্যাচে ৪-৩-৩ ফর্মেশনে দল সাজিয়েছিলেন লিওনেল স্কালোনি। আক্রমণভাগে লাউতারো মার্টিনেজ ও থিয়াগো আলমাদার সাথে ফ্রি-রোলে খেলেন লিওনেল মেসি। মধ্যমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও রদ্রিগো ডি পলের ত্রয়ী পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল। আলজেরিয়া শুরুর দিকে বেশ গোছানো ফুটবল খেললেও আর্জেন্টিনার হাই-প্রেসিং ফুটবলের সামনে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি। বিশেষ করে ম্যাচের ৭৯ মিনিটে মেসি যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন প্রতিপক্ষ সমর্থকরাও দাঁড়িয়ে এই জাদুকরকে করতালি দিয়ে সম্মান জানান।
পরিসংখ্যানের পাতায় মহাজাগতিক মেসি
এই তিন গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সব রেকর্ড ওলটপালট করে দিয়েছেন এলএমটেন। পুরুষ ফুটবল ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে খেলার অনন্য রেকর্ডের পাশাপাশি তিনি এখন বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
পুরুষ ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকা:
| স্থান | খেলোয়াড় | জাতীয় দল | গোল সংখ্যা |
| =১ | লিওনেল মেসি | আর্জেন্টিনা | ১৬ |
| =১ | মিরোস্লাভ ক্লোসা | জার্মানি | ১৬ |
| ৩ | রোনালদো নাজারিও | ব্রাজিল | ১৫ |
| ৪ | কিলিয়ান এমবাপ্পে | ফ্রান্স | ১৪ |
| ৫ | গের্ড মুলার | জার্মানি | ১৪ |
সংক্ষিপ্ত ম্যাচ পরিসংখ্যান: আর্জেন্টিনা ৩ – ০ আলজেরিয়া
- গোলদাতা: লিওনেল মেসি (১৭’, ৬০’, ৭৬’)
- মেসির ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান: ৩ গোল, ৫টি শট, ৮০ মিনিট খেলার সময়।
- আর্জেন্টিনা পরিবর্তন: নাহুয়েল মোলিনা (৪৫’), নিকোলাস গঞ্জালেস (৫৪’), হুলিয়ান আলভারেজ (৫৪’), নিকো পাজ (৭৯’), নিকোলাস ওটামেন্ডি (৭৯’)।
- আলজেরিয়া পরিবর্তন: হুসেম আউয়ার (৬৩’), মোহাম্মদ আমৌরা (৬৩’), রিয়াদ মাহরেজ (৬৩’), রামীজ জেরুকি (৮১’), আদিল বুলবিনা (৮১’)।
২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচ হেরে শুরু করা আর্জেন্টিনা এবার আর কোনো ভুল করেনি। এই দাপুটে জয় দিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা বাকি দলগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রাখল—শিরোপা ধরে রাখতেই মিশন শুরু করেছে আলবিসেলেস্তেরা।
