দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি শাহাদাত হোসেন নিশ্চিত করেছেন।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পূর্বেই বেনজীর আহমেদ দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুদক একাধিক মামলা দায়ের করে। গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন, যার ধারাবাহিকতায় এই গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়।
এদিকে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) কমিশনার, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কর্মী ড. নাবিলা ইদ্রিস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য শেয়ার করেছেন। সরকারের গঠিত ‘গুম কমিশন’ বা গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের প্রতিবেদনের একটি বিশেষ অংশ উল্লেখ করে তিনি তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা ও বেনজীর আহমেদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
ড. নাবিলা ইদ্রিস তাঁর পোস্টে লিখেছেন:
“গুম কমিশনের প্রতিবেদনে, শেষের দিকে একটি টেবিল বা তালিকা রয়েছে। সেখানে আমাদের মোট ১,৫০০টিরও বেশি মামলার নথিপত্র থেকে ২৫০টিরও বেশি গুমের একটি উপসেট (সাবসেট) নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই তালিকায় সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে যে প্রতিটি গুমের ঘটনায় কার ওপর ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা নেতৃত্বের দায় বর্তায়; যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্তদের নাম, পদবি, আইডি নম্বর, অবস্থান এবং তাঁদের কার্যকাল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পেছনের ভাবনাটি ছিল খুবই সাধারণ। আজ না হোক কাল, কিংবা কোনো এক সুদূর ভবিষ্যতে—এই অপরাধগুলোর জন্য একদিন জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবেই। এই টেবিলটি ছিল ইতিহাসের সাথে আমাদের একটি সাক্ষাৎ বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
যাই হোক, আপনাদের মধ্যে যাদের চোখ তীক্ষ্ণ বা সজাগ, তারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে এই টেবিলের ফন্টের আকার (font size) রিপোর্টের বাকি অংশের চেয়ে কিছুটা ছোট। আপনারা কি জানেন এর কারণ কী?
কারণ বেনজীর আহমেদের নামের সারিটি (row) এতটাই বড় হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁর ভুক্তভোগীর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, স্বাভাবিক ফন্ট সাইজে সেটিকে সুন্দরভাবে সাজানো বা জায়গা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না! ফলস্বরূপ, পুরো টেবিলটি যেন ঠিকঠাক মানিয়ে যায়, সেজন্য আমাকে বাধ্য হয়ে পুরো টেবিলের ফন্টের আকার ছোট করতে হয়েছিল।”
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আসা বেনজীর আহমেদ ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র্যাবের মহাপরিচালক এবং ডিএমপি কমিশনার হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন। মানবাধিকার কর্মী ও গুম কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, দুবাইয়ে তাঁর এই গ্রেপ্তার কেবল আর্থিক দুর্নীতির মামলাই নয়, বরং অতীতের গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করতে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।
