ফারাক্কা: বাংলাদেশের নদীর বুকে পঞ্চাশ বছরের ক্ষত

আজ ১৬ মে। ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে, ১৯৭৬ সালের এই দিনে, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ডাকে লাখো মানুষ রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে রওনা দিয়েছিল ফারাক্কার পথে — প্রতিবাদের, অস্তিত্বের, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে। সুবর্ণজয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে সেই সংগ্রামের ইতিহাস, বাংলাদেশের ওপর ফারাক্কার বিধ্বংসী প্রভাব এবং এখনো চলমান যন্ত্রণার পূর্ণচিত্র তুলে ধরেছে গণতার।

ফারাক্কা বাঁধ: উৎপত্তি ও নির্মাণের ইতিহাস

কেন তৈরি হলো এই বাঁধ?

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভাগের পরপরই ভারত গঙ্গা নদীর ওপর একটি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করতে শুরু করে। মূল উদ্দেশ্য ছিল হুগলি নদীতে পানি সরবরাহ করে কলকাতা বন্দরকে পলিমুক্ত রেখে সচল রাখা। কেন্দ্রীয় জল কমিশনের প্রস্তাব ছিল — গঙ্গা নদী থেকে একটি দীর্ঘ ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে হুগলিতে পানি সরানো হবে, এবং সেই লক্ষ্যে ফারাক্কায় একটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে।

এই প্রকল্পটি ছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর স্বপ্নের প্রকল্প। নির্মাণ শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকের প্রথম ভাগে। তাঁর মৃত্যুর পরও প্রকল্প এগিয়ে চলে এবং অবশেষে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ উদ্বোধন করেন।

কোথায় এই বাঁধ?

ফারাক্কা ব্যারাজ অবস্থিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে, বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে গঙ্গা নদীর ওপর। বাঁধটি নির্মাণ করেছে হিন্দুস্তান কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এবং এতে মোট ১০৯টি গেট রয়েছে।

৪১ দিনের “পরীক্ষা” যা আর শেষ হয়নি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর ভারত সরকার ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করার উদ্যোগ নেয়। প্রথমে ফিডার ক্যানেলে পানিপ্রবাহের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক চালুর কথা বলে মাত্র ৪১ দিনের জন্য (২১ এপ্রিল ১৯৭৫ থেকে ৩১ মে ১৯৭৫) ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হয়। সেই পরীক্ষামূলক প্রত্যাহারই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে যায়।

১৬ মে ১৯৭৬: ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ

ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ তার ভয়াবহ পরিণাম অনুভব করতে শুরু করে। পদ্মার পানি কমে যেতে থাকে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো শুকাতে থাকে, কৃষিজমিতে সেচের পানি নেই। এই অবস্থায় দেশের সবচেয়ে সাহসী কণ্ঠস্বর মওলানা ভাসানী সোচ্চার হয়ে উঠলেন। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন: “পিন্ডির জিঞ্জির ছিন্ন করেছি, দিল্লির দাসত্ব করতে নয়।” এবং মরণবাঁধ ফারাক্কা ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানান।

লংমার্চের বিবরণ

১৯৭৬ সালের ১৬ মে সকাল ১০টায় রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান থেকে লংমার্চ শুরু হয়। দেশের সর্বস্তরের লাখো মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। মিছিল দুপুর ২টায় পৌঁছায় গোদাগাড়ীর প্রেমতলীতে, সন্ধ্যা ৬টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজ মাঠে রাত্রিবিরতি হয়। পরদিন মহানন্দা নদী নৌসেতু তৈরি করে পার হয়ে মিছিল পৌঁছায় ভারত সীমান্তসংলগ্ন কানসাট হাইস্কুল মাঠে।

বৃদ্ধ, অসুস্থ ভাসানী বার্ধক্য ও অসুস্থতা উপেক্ষা করে মিছিলের সামনের কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন। কানসাটের বিশাল সমাবেশে তিনি ঘোষণা করেন: “বাংলাদেশের মানুষ এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। আজ কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হলো, তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির রুখে দাঁড়ানোর জ্বলন্ত নজির।”

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এই লংমার্চ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। বিশ্বের প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোতে ফলাও করে খবর প্রচার হয়। পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত পরবর্তীতে বলেছেন: “একমাত্র ভাসানীর লংমার্চের সময়ই ভারত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি নিয়েছিল — তখন তারা সত্যিই ভেবেছিল ভাসানী ফারাক্কা ভেঙে ফেলবে।”

সেই দিন থেকেই প্রতি বছর ১৬ মে বাংলাদেশে ফারাক্কা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশের ওপর ফারাক্কার বিধ্বংসী প্রভাব

গবেষকদের মতে, ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে গঙ্গার পানি ও পলি সরানোর ফলে বাংলাদেশের কৃষি, নৌচলাচল, সেচ, মৎস্য, বনায়ন, শিল্প, উপকূলীয় নদীতে লবণাক্ততা এবং ভূগর্ভস্থ পানি — সবকিছুতেই বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

কৃষি ও সেচ সংকট: নদী গবেষক ড. মাহবুব সিদ্দিকীর দাবি অনুযায়ী, গত ৪০ বছরে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে পদ্মা নদীর আয়তন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে, নদীর গভীরতা কমেছে ১৭.৮ শতাংশ এবং পানিপ্রবাহ কমেছে ২৬.২ শতাংশ।

লবণাক্ততা ও সুন্দরবন সংকট: বিশেষজ্ঞদের মতে, গোরাই নদী — যা গঙ্গার প্রধান শাখা এবং সুন্দরবনের প্রাণশক্তি — সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে, যা কোটি কোটি মানুষের ঘূর্ণিঝড়-সুরক্ষার স্বাভাবিক ঢাল।

ইলিশ ও মৎস্যসম্পদের বিনাশ: নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হওয়ায় হিলসা মাছসহ জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক সংকটে পড়েছে বলে পরিবেশ গবেষকরা জানাচ্ছেন। একসময় পদ্মায় প্রচুর দেখা যাওয়া ডলফিন ও ঘড়িয়াল এখন বিরল।

নৌপথ ধ্বংস: নদী গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, গঙ্গা-পদ্মার প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার নৌপথ আজ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা: ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৪৯তম বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও নদী গবেষক ড. মাহবুব সিদ্দিকীর দাবি, কমপক্ষে ৬ কোটি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত — উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২ কোটি এবং দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে প্রায় ৪ কোটি। তবে এ বিষয়ে সরকারি কোনো অফিসিয়াল পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশিত হয়নি।

১৯৯৬ সালের চুক্তি: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবে গৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী শুকনো মৌসুমে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে) বাংলাদেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি দেওয়ার কথা।

কিন্তু বাস্তবে কী হয়েছে? The Diplomat-এ প্রকাশিত পানি বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩০০টি দশদিনা পর্যায়ের মধ্যে ৯৪টিতে বাংলাদেশ চুক্তির তুলনায় কম পানি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী পানি পেয়েছে মাত্র তিন বছর।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরই। কূটনৈতিক সূত্র ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বরাতে জানা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বাংলাদেশ ৪০ হাজার কিউসেক গ্যারান্টি চাইলে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে।

২০২৬ সালে ফারাক্কা: দুর্ভোগ কি কমেছে?

এই বছর ফারাক্কা দিবসের পঞ্চাশ বছর পূর্তি। কিন্তু উদযাপনের কিছু নেই।

সমস্যা বরং আরো জটিল হয়েছে। ভারত এখন শুধু ফারাক্কায় নয়, উজানে সিকিম ও উত্তর-পূর্ব ভারতেও নতুন জলবিদ্যুৎ ও সেচ প্রকল্প তৈরি করছে। The Diplomat-এর বিশ্লেষণ বলছে, এই নতুন প্রকল্পগুলো ১৯৯৬ সালের চুক্তির হিসাবকে আরো অকার্যকর করে তুলছে।

বন্যা-খরার দ্বিমুখী মার এখন নিয়মিত। Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতের বাঁধ থেকে অনিয়ন্ত্রিত পানি ছাড়ায় বন্যায় বাংলাদেশে ১১ লাখ টন ধান নষ্ট হয়েছে।

এবং সবচেয়ে জরুরি খবর — এই বছরই ১৯৯৬ সালের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্র ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বরাতে জানা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বাংলাদেশ ৪০ হাজার কিউসেক গ্যারান্টি চাইলে ভারত তা নাকচ করে দিয়েছে।

মজার বিষয় হলো, ভারতেও এখন ফারাক্কাবিরোধী মত জোরালো হচ্ছে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ফারাক্কা ভেঙে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছেন। সমাজকর্মী মেধা পাটকারসহ অনেক ভারতীয় বিশেষজ্ঞও বলছেন, ফারাক্কা এখন ভারতেরও বেশি ক্ষতি করছে সুবিধার চেয়ে।

সুবর্ণজয়ন্তীতে দাবি ও প্রত্যাশা

আজ ফারাক্কা দিবসের ৫০ বছর পূর্তিতে নদীবিশেষজ্ঞ, পরিবেশকর্মী ও রাজনীতিকদের কণ্ঠে একই দাবি — একটি ন্যায়সংগত, কার্যকর ও গ্যারান্টিযুক্ত নতুন চুক্তি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন নতুন চুক্তিতে পানির পরিমাণ বাড়ানো, নদীর ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং উজানের নতুন প্রকল্পের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া অপরিহার্য।

বর্তমান সরকার প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। সরকারি দাবি অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের ২৪টি জেলার কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

পানির জন্য সংগ্রাম থামেনি

পঞ্চাশ বছর আগে মওলানা ভাসানীর সেই বজ্রকণ্ঠ আজও পদ্মা অববাহিকার বাতাসে অনুরণিত হয়। অশীতিপর, অসুস্থ এই নেতা যখন লাখো মানুষের আগে হেঁটেছিলেন, তিনি শুধু পানির দাবি করেননি — তিনি একটি জাতির আত্মসম্মানের কথা বলেছিলেন।

ফারাক্কা শুধু একটি বাঁধের নাম নয় — এটি একটি অসম সম্পর্কের প্রতীক, যেখানে ভাটির মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপেক্ষা করছে তার ন্যায্য পানির জন্য। ২০২৬ সালে ১৯৯৬ চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে — এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ, শুধু চুক্তি নবায়নের নয়, একটি সত্যিকারের ন্যায়বিচারের।

পঞ্চাশ বছর পরেও প্রশ্ন একটাই: পদ্মার পানি কবে ফিরবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *