মাশরাফির পতন, একটি রিগড নির্বাচন, এবং যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়
গণতার বাংলা | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
কালবেলায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকার গতকাল সারাদিন বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে ঘুরেছে। কথা বলেছেন গোলাম মুর্তজা, মাশরাফি বিন মুর্তজার বাবা। ছেলে তাকে নাকি বলেছেন, “আমি মারা গেলে আমার লাশও নড়াইলে নিয়ো না।”
একসময় যাকে ডাকা হতো ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’, সেই মানুষটি এখন নিজের জন্মশহরে লাশ নিয়ে যেতেও ভয় পান। এই একটি বাক্যে অনেক কিছু আছে।
বাবা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, পরিবারের আর্থিক অবস্থাও এখন করুণ। তার ভাষায়, “আমাদের নগদ টাকা-পয়সা কখনোই তেমন ছিল না। জমি-জমা ও খামার নিয়েই জীবন চলে।” মাশরাফি নিজে কোথায় আছেন, তা কেউ জানে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের পর নড়াইলে তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ মানুষ। তারপর থেকে তিনি আর প্রকাশ্যে আসেননি।
সংবাদটি পড়ে অনেকে সহানুভূতি জানিয়েছেন। অনেকে আবার ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। এই দুটো প্রতিক্রিয়াই একসাথে বোঝার চেষ্টা করতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে।
মাঠ থেকে সংসদে
মাশরাফি বিন মুর্তজা বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম সেরা মুখ ছিলেন। হাঁটুতে একের পর এক অস্ত্রোপচার করে মাঠে ফিরে আসার গল্প তাকে একটি আলাদা মাত্রা দিয়েছিল, সাধারণ মানুষ তাকে ভালোবাসত বিশেষ একটি কারণে। তিনি শুধু জেতেননি, অনেক কষ্টেও হার মানেননি। নড়াইলে তিনি ‘প্রিন্স অব হার্টস’ নামে পরিচিত ছিলেন।
২০১৮ সালের নভেম্বরে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে, তিনি ঘোষণা দিলেন নড়াইল-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। খবরটা বাংলাদেশে তোলপাড় ফেলে দিল। তিনি তখন সক্রিয় জাতীয় দলের অধিনায়ক। বিশ্বে এর আগে কোনো সক্রিয় ক্রিকেট অধিনায়ক দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে জিতেছেন এমন নজির ছিল না।
সমালোচনার জবাবে মাশরাফি বললেন রাজনীতিতে আসা তার কাছে “সময়ের প্রয়োজন”। “আমি বিশ্বাস করি প্রতিটি সচেতন, যোগ্য ও সৎ বাংলাদেশির রাজনীতিতে আসা উচিত”, এমন কথা তিনি বলেছিলেন। বিশ্বকাপের পর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথাও উল্লেখ করলেন। তবে কোন দলের হয়ে তিনি মাঠে নামলেন, সেই প্রশ্নটা অনেকের মনে থেকে গেল।
নির্বাচনের আগের বাংলাদেশ
৩০ ডিসেম্বর ২০১৮। এই তারিখটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন।
নির্বাচনের আগেই পরিবেশ কী ছিল সেটা বোঝা দরকার। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের “ক্রিয়েটিং প্যানিক” শিরোনামের বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে, ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং মুক্ত মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে হুমকি তৈরি হয়েছে। সংস্থার এশিয়া পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী ও স্বাধীন কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, ডিসেম্বরের মাত্র প্রথম দুই সপ্তাহে সহিংসতার ৪৭টি ঘটনায় আট জন নিহত এবং ৫৬০ জন আহত হয়েছিল। বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি অনুযায়ী, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে তাদের প্রায় ২১,০০০ কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বিএনপির ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫২ জন প্রার্থী আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ ছিল।
আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস (FIDH) সহ ১৫টি আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশকে সরাসরি “অগণতান্ত্রিক” বলে চিহ্নিত করা হয়। তারা বলেছিল, সহিংসতার পরিবেশ, বিচারিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার এবং নাগরিক সমাজের প্রতি বৈরিতার কারণে এই নির্বাচনকে স্বাধীন ও সুষ্ঠু বলা যায় না।
ভোটের দিন পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশে কমপক্ষে তিনজন ভোটার, যার মধ্যে একজন সাংবাদিক ছিলেন, জানান তাদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, অথবা বলা হয়েছে তাদের ব্যালট আগেই পূরণ হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন নিজেই কারচুপির অভিযোগ তদন্তের কথা জানিয়েছিল। ভোটের পর আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি জিতে নেয়। বিরোধী দল নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে এবং পুনর্নির্বাচনের দাবি জানায়।
নড়াইল-২: সংখ্যার রহস্য
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যখন সারা দেশের চিত্র নিয়ে কথা বলছিল, নড়াইল-২ আসনে তখন কী হচ্ছিল?
মাশরাফি বিন মুর্তজা এই আসনে মোট বৈধ ভোটের ৯৬ শতাংশেরও বেশি পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এ জেড এম ফরিদুজ্জামান পেয়েছিলেন মাত্র ৭,৮৮৩ ভোট। ব্যবধান ৩৪ গুণেরও বেশি।
কিন্তু বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের দেওয়া কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল দেখলে আরো অবাক করার মতো চিত্র বেরিয়ে আসে।
কেন্দ্র নম্বর ২২, সরুশুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মোট ১,৮৭২টি বৈধ ভোটের সবগুলো নৌকায়, বিরোধী কোনো প্রার্থীর খাতায় একটিও নয়। কেন্দ্র নম্বর ২৪, মাকড়াইল কেকেএস ইনস্টিটিউশন। ২,৬২৪টি বৈধ ভোট, সবই নৌকায়। কেন্দ্র নম্বর ২৬, শেখপাড়া বাতাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১,২২৬টি বৈধ ভোট, সবই নৌকায়। কেন্দ্র নম্বর ৩২, নোয়াগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৩,২৭৮টি ভোট পেয়েছেন মাশরাফি, বিএনপির ধানের শীষ প্রার্থী পেয়েছেন শূন্য। কেন্দ্র নম্বর ৩৩, দেবী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২,৪২০টি ভোট, সবই নৌকায়।
এই চিত্র শুধু কয়েকটি কেন্দ্রের নয়। আসনের ১৪০টি কেন্দ্রের একটির পর একটিতে একই ছবি। এই তালিকা দীর্ঘ।
এটি স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এমনকি সবচেয়ে একপেশে নির্বাচনেও কোনো কেন্দ্রে কোনো বিরোধী প্রার্থী শূন্য ভোট পান না, কারণ প্রতিটি কেন্দ্রে বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টরাও থাকেন, তারাও ভোট দেন। প্রতিটি কেন্দ্রে নৌকার ভোট মানেই বৈধ ভোটের মোট সংখ্যার সমান, আর বাকি সকলের ভোট শূন্য। পরিসংখ্যানগতভাবে এটি প্রায় অসম্ভব, যদি না ভোট আগেই সিল করা থাকে।
| # | কেন্দ্রের নাম | মোট ভোটার | বৈধ ভোট | নৌকা (মাশরাফি) | ধানের শীষ | উপস্থিতি |
|---|
দ্বিতীয় মেয়াদ, একই রাজনীতি
২০১৮ সালের পর মাশরাফির রাজনৈতিক যাত্রা থামেনি। ২০২২ সালে তিনি আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, যে নির্বাচনে আবারো প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ নেয়নি, সেই নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয়বার নড়াইল-২ থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন এবং জাতীয় সংসদের হুইপ নিযুক্ত হন। তিনি জিতেছিলেন ১,৮৯,১০২ ভোট পেয়ে, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছিলেন মাত্র ৪,০৪১ ভোট।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী সরাসরি বলেছিলেন, বাংলাদেশের গত দুটি জাতীয় নির্বাচনই “স্বাধীন ও ন্যায্য ছিল না, সহিংসতা, বিরোধী দলের উপর নিপীড়ন, ভোটার ও প্রার্থীদের ভয় দেখানো দিয়ে চিহ্নিত।”
মাশরাফি এই দুটি নির্বাচনেরই সুবিধাভোগী ছিলেন।
আগুন যখন গণভবনের দিকে
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু সরকারের প্রতিক্রিয়া সেই আন্দোলনকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়। পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবি মিলে গুলি চালায় নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের উপর। জাতিসংঘের তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে যে ১৬ জুলাই থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে কমপক্ষে ৬৫০ জন নিহত হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন মৃতের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়েছে এবং ৪০০-এরও বেশি ছাত্র দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন ২০,০০০-এরও বেশি মানুষ। আন্দোলনে নিহতদের মধ্যে ছিল শিশু, সাংবাদিক, রিকশাচালক এবং বারান্দায় কাপড় শুকাতে দিতে যাওয়া অন্তঃসত্ত্বা মা। ৭৭ শতাংশের মৃত্যু ঘটেছে গুলিতে।
এই দিনগুলোতে মাশরাফি বিন মুর্তজা নীরব ছিলেন। যে মানুষটি একসময় লাখো মানুষের আবেগের জায়গা ছিলেন, সেই মানুষটি তার নির্বাচনী এলাকার ছেলেমেয়েদের বুকে গুলি লাগছে দেখেও একটি কথা বলেননি। বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন তারা মাশরাফির এই নীরবতার প্রতিবাদ করছেন।
শুধু নীরবতা নয়, আরো একটি বিষয় সামনে এসেছে।
৪ আগস্ট ২০২৪, অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিন। সেই দিনই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ, সারা দেশে প্রায় ৯১ জন নিহত হয়েছিলেন। এই দিনে নড়াইল সদর উপজেলার সীমাখালী-মালিবাগ এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে দায়ের করা মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, সেদিন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে বোমা ও গুলি চালায়, বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন।
নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র বোস, যিনি মাশরাফির মনোনয়ন ফর্মও সংগ্রহ করেছিলেন ২০২৩ সালে, সেই মামলার ৩ নম্বর আসামি। আর ১ নম্বর আসামি? মাশরাফি বিন মুর্তজা নিজে। ২ নম্বর আসামি তার বাবা গোলাম মুর্তজা। ৯০ জন নামীয় ও অজ্ঞাতপরিচয় ৪০০-৫০০ জনকে আসামি করে সদর থানায় মামলা করেন সদর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মুজাহিদুর রহমান পলাশ।
বাড়িতে আগুন, তারপর অন্ধকার
৫ আগস্ট ২০২৪। শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে দেশ ছাড়লেন। সেদিনই নড়াইলে মাশরাফির বাড়ি ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীরা বলছিলেন, গণহত্যার সময় নীরব থাকার মূল্য দিতে হবে। তারপর থেকে মাশরাফি কোথায় আছেন, কেউ জানে না।
যা জানা যায়, তার বাবা এখন একা একটি সাক্ষাৎকারে কথা বলছেন। জানাচ্ছেন ছেলের মনের কথা। জানাচ্ছেন সংসারের কথা।
এটি কি নিয়তি নাকি চ্যুজেন ফেইট?
মাশরাফির গল্পটা শুধু তার নিজের নয়। এটা একটি প্যাটার্নের গল্প। যখন একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার জনপ্রিয় মুখগুলোকে তার বৈধতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, এবং সেই মুখগুলো জেনেশুনে সেই ভূমিকায় অভিনয় করে। মাশরাফি শুধু সংসদ সদস্য হননি। তিনি দুটো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, দলের বড় পদ নিয়েছেন, এবং যখন সেই দল হাজারো মানুষের বুকে গুলি করাচ্ছিল, তখন তিনি চুপ ছিলেন।
মাশরাফির বাবার কথায় একটা বেদনা আছে, অস্বীকার করার উপায় নেই। একজন বৃদ্ধ মানুষ তার ছেলের জন্য কষ্ট পাচ্ছেন, এটা মানবিক বাস্তবতা। কিন্তু ইতিহাস কেবল বেদনায় লেখা হয় না, সিদ্ধান্তেও লেখা হয়।
যে কেন্দ্রগুলোতে বিরোধী প্রার্থীরা শূন্য ভোট পেয়েছিলেন, যে হাজারো মানুষ নির্বাচনে ভোট দিতেই পারেননি, যে শিক্ষার্থীরা ২০২৪ সালে বুকে গুলি খেয়েছেন, তাদের কষ্টের হিসাবটা কে রাখবে?
মাশরাফি বিন মুর্তজা হয়তো এখন কোনো নিরাপদ জায়গায় আছেন। হয়তো একদিন ফিরে আসবেন। কিন্তু তার সেই চুপ থাকার দিনগুলো, সেই ভোটের রাতের শূন্য কলামগুলো, আর নড়াইল সদরে যে রক্ত পড়েছিল সেদিন, এগুলো মুছে যাওয়ার নয়।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, জাতিসংঘ মানবাধিকার দফতর (OHCHR), ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস (FIDH), ফোর্টিফাই রাইটস, ঢাকা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, কালবেলা, ESPNcricinfo, ডন নিউজ।
