মা — দুটো অক্ষর, একটা গোটা পৃথিবী

রাত তিনটা বাজে। বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু একজন মানুষ জেগে আছেন। চোখের নিচে কালি, হাতে ঠান্ডা পানির বাটি। জ্বরে কাঁপতে থাকা সন্তানের কপালে বারবার হাত রাখছেন। ঘুম নেই। ক্লান্তি নেই। শুধু আছে সেই এক অদ্ভুত টান, যেটার কোনো নাম হয় না, শুধু একটাই ডাক আছে।

মা।

একটি শব্দ। কিন্তু, একটি শব্দের ভেতরে যা আছে, হাজার রাতের নির্ঘুম চোখ, না বলা কষ্ট, নিজেকে শেষ করে দিয়ে সন্তানকে গড়ে তোলার গল্প, সেটা কোনো ডিকশনারি ধরতে পারে না।

আজ মা দিবস। আর আজকের এই দিনটা শুধু ফুল দেওয়া বা ক্যাপশন দেওয়ার জন্য না। এর পেছনে আছে একটা অনেক পুরনো, অনেক ভারী গল্প।

যেভাবে এলো মা দিবস

আধুনিক যুগে মা দিবসের উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্র থেকে। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয় এটি। এই চিন্তাটা প্রথম আসে ফিলাডেলফিয়ার আনা জার্ভিসের মাথা থেকে। ১৯০৭ সালের ১২ মে তিনি তাঁর মাকে নিয়ে একটি ছোট্ট স্মরণসভার আয়োজন করেন।

আনা জার্ভিসের মা নারীদের একসঙ্গে করে বন্ধুত্ব ও স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতেন। মায়েদের সন্তান মানুষ করাটা যে কতটা পরিশ্রমের কাজ, সেটা সবাইকে জানাতে চেয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু এই গল্পের শুরু আরো আগে থেকে। আনা জার্ভিসের মা, আনা রিভস জার্ভিস, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনে মায়েদের একটি “ডে ওয়ার্ক ক্লাব” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল শিশু মৃত্যুহার কমিয়ে আনা। কারণ তিনি নিজেও তাঁর বারোটি সন্তানের মধ্যে আটটি সন্তান হারিয়েছিলেন। দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মহামারি। প্রতিটি মৃত্যু তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু ভাঙার বদলে তিনি লড়েছিলেন, যাতে অন্য মায়েরা এই কষ্ট না পান।

১৮৭৬ সালে, এক সানডে স্কুলের ক্লাস শেষে তিনি একটি প্রার্থনা করেছিলেন যা তাঁর মেয়ে আনা সারাজীবন ভুলতে পারেননি।

“আমি আশা করি এবং প্রার্থনা করি, কেউ একদিন একটি মা দিবস প্রতিষ্ঠা করবে। মায়েরা মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে অতুলনীয় সেবা দেন, তার স্বীকৃতি হিসেবে। তারা এই স্বীকৃতির যোগ্য।”

সেই কথাগুলো ১২ বছর বয়সী আনার বুকে গেঁথে গিয়েছিল।

মায়ের মৃত্যু, মেয়ের সংকল্প

১৯০৫ সালের ৯ মে, মঙ্গলবার। আনা রিভস জার্ভিস মারা গেলেন। তাঁর মেয়ে আনা জার্ভিস সেদিন ভেঙে পড়লেন। কিন্তু সেই ভাঙনের ভেতর থেকেই জন্ম নিলো এক অদ্ভুত সংকল্প। মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি মনে মনে বললেন, সেই কেউটা আমি।

মায়ের মৃত্যুর দুই বছর পর, ১৯০৭ সালের ১২ মে, আনা জার্ভিস গ্রাফটনের Andrews Methodist Episcopal Church-এ আয়োজন করলেন একটি ছোট্ট স্মরণসভা। ওই তারিখটা বেছে নিয়েছিলেন কারণ মায়ের মৃত্যুর পর সেটাই ছিল কাছাকাছি একটি রোববার। যে চার্চে তাঁর মা পঁচিশ বছর ধরে সানডে স্কুল পড়াতেন, সেখানেই মায়ের উদ্দেশ্যে সেই ছোট্ট অনুষ্ঠান।

এরপর থামেননি তিনি। চিঠি লিখলেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গির্জার নেতা, সাংবাদিক, যাকে পেলেন তাকেই। নিজের পকেটের টাকায় বই ছাপিয়ে বিতরণ করলেন। তিনি নিজে কখনো বিয়ে করেননি, সন্তানও ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর সব মায়ের জন্য লড়েছেন একা।

১৯০৮ সালের ১০ মে, ওই একই চার্চে হলো প্রথম আনুষ্ঠানিক মা দিবস উদযাপন। সেদিন আনা সেখানে যেতে পারেননি, ফিলাডেলফিয়ায় আরেকটা অনুষ্ঠান ছিল। কিন্তু গ্রাফটনের চার্চে পাঠিয়ে দিলেন ৫০০টি সাদা কার্নেশন ফুল, এক একটি মায়ের প্রতীক হিসেবে।

এরপরের পাঁচ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সবকটি রাজ্যে মা দিবস পালনের চল শুরু হয়। আর ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন দিনটাকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। বললেন, এটা দেশের মায়েদের প্রতি “ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ্য প্রকাশ।”

সেই থেকে প্রতি বছরের মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বেশিরভাগ জায়গায় মা দিবস পালন হয়ে আসছে।

যে গল্পটা কেউ বলে না

মা দিবসের প্রতিষ্ঠাতার শেষটা কিন্তু ভালো হয়নি।

যে দিনটা আনা ভালোবাসা দিয়ে গড়েছিলেন, সেটা খুব দ্রুতই বাণিজ্যের হাতে চলে গেলো। ফুলের দোকান, গ্রিটিং কার্ড কোম্পানি, চকলেট নির্মাতারা, সবাই মা দিবস থেকে টাকা বানাতে লাগলো।

আনা ক্ষেপে গেলেন। বললেন, “একটা প্রিন্টেড কার্ড মানে তুমি মাকে নিজের হাতে লেখার সময়টুকুও দিতে পারলে না।” মা দিবস বাতিল করতে আইনি লড়াই শুরু করলেন। সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলো।

১৯৪৩ সালে তাঁকে একটা স্যানিটোরিয়ামে ভর্তি করা হলো। ইতিহাস বলে, ফুল ও গ্রিটিং কার্ড ব্যবসায়ীরাই তাঁর সেখানকার খরচ দিতেন, সেটা জানতেনও না আনা।

১৯৪৮ সালের ২৪ নভেম্বর, একা, নিঃস্ব অবস্থায় মারা গেলেন আনা জার্ভিস।

যে মেয়ে সারা পৃথিবীর মায়েদের জন্য একটা দিন এনে দিলেন, তাঁর নিজের কোনো সন্তান ছিল না। আর তিনি যে দিবস বানিয়েছিলেন, সেটাকেই শেষ জীবনে ঘৃণা করতেন।

এই গল্পটা মনে রাখলে মা দিবসের মানে একটু বদলে যায়।

মা মানে শুধু মমতা না, মা মানে প্রতিরোধও

বাংলাদেশে মা শব্দটার ওজন একটু আলাদা।

এখানে মা মানে সেই গার্মেন্টস কর্মী যিনি ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে যান ছেলেমেয়ের পড়ার খরচ জোগাতে। মা মানে সেই কৃষক মহিলা যিনি একা জমি চাষ করেন। মা মানে শহরের সেই নারী যিনি ক্যারিয়ার আর সংসার দুটো একসাথে টেনে নিয়ে চলেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ও দেখা গেছে, মায়েরা রাস্তায় নেমেছেন, সন্তানের পাশে দাঁড়িয়েছেন, বুক পেতে দিয়েছেন। কেউ কেউ সন্তান হারিয়েছেন। তবুও থামেননি।

মা শুধু ঘরের কোণে বসে থাকেন না। মা প্রতিরোধেরও নাম।

শেষ কথা

মা দিবস আসে একদিনের জন্য। কিন্তু মা থাকেন সারাজীবন, সকালের ডাকে, দুপুরের খাবারে, রাতের দোয়ায়।

আনা জার্ভিস চেয়েছিলেন এই দিনটা হোক একদম ব্যক্তিগত। ফুল না, কার্ড না, শুধু মায়ের কাছে বসো। হাত ধরো। বলো যেটা সারাবছর বলা হয় না।

আজকে সেটা বলার দিন।

পৃথিবীর প্রতিটি মাকে সালাম।

মা, তুমি বিপ্লবের আরেক নাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *