
লেখাঃ আলমগীর মোহাম্মদ
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক
বাংলা সাহিত্যে রম্য ও ব্যঙ্গাত্মক রচনার ধারা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও সুপ্রাচীন হলেও মননশীলতা, তীব্র সমাজসচেতনতা ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দর্শনের এক অপূর্ব মিশেলে এই ধারাকে যিনি গণমানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন, তিনি আসহাব উদ্দীন আহমদ। তাঁর কাছে সাহিত্যচর্চা নিছক চিত্তবিনোদনের মাধ্যম ছিল না। ছিল সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের বুকে জেঁকে বসা নানামুখী অসঙ্গতি ও শোষণের বিরুদ্ধে এক তীব্র, শাণিত ও আপসহীন লড়াই।
১৯১৪ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার সাধনপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ক্ষণজন্মা মানুষটি আজীবন সাধারণ মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। আর তাঁর সেই আজীবনের আদর্শিক ও সংগ্রামী জীবনের অবিকল প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে প্রতিটি সাহিত্যকর্মে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী প্রাজ্ঞ ও অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর গদ্যের ধরন ছিল আশ্চর্য রকমের সহজ, সাবলীল এবং সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি। কোনো প্রকার কৃত্রিমতা, পাণ্ডিত্য প্রকাশের লোভ কিংবা ভাষার জটিল মারপ্যাঁচ ছাড়া কীভাবে গভীর জীবনবোধ ও রাজনৈতিক দর্শনকে সাহিত্যের পাতায় অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, আসহাব উদ্দীন আহমদের সাহিত্যচর্চা তারই এক কালজয়ী ও কালোত্তীর্ণ উদাহরণ।
তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যিক জীবনের পটভূমির দিকে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ১৯৫৪ সালের আইনসভার সদস্য বা এমএলএ নির্বাচিত হওয়ার পর এবং প্রগতিশীল বামপন্থী আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকার কারণে তিনি সমাজকে খুব কাছ থেকে এবং অতি নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। ক্ষমতার অলিন্দ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খেটে খাওয়া কৃষকের কুঁড়েঘর—সবখানেই ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত। এই দেখার গভীরতা থেকেই তাঁর মনস্তত্ত্বে জন্ম নেয় এক তীব্র রসবোধ ও ব্যঙ্গাত্মক চেতনা, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্য রচনার মূল ভিত্তি বা স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।
তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, গুরুগম্ভীর তত্ত্বকথা কিংবা ভারী ভারী রাজনৈতিক বুলি দিয়ে সাধারণ মানুষকে যতটা না জাগানো যায় বা সমাজকে নাড়া দেওয়া যায়, তার চেয়ে ঢের বেশি কার্যকর হয় যদি চাবুকের মতো শাণিত হাস্যকৌতুকের মাধ্যমে সমাজের ভেতরের আসল পচন ও ভণ্ডামিকে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া যায়। তাঁর বিখ্যাত ও যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘ধাপ্পাবাজি’ এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও অকাট্য প্রমাণ। এই বইটিতে তিনি তৎকালীন রাজনীতির অন্দরমহলের ভণ্ডামি, আমলাতন্ত্রের জটিল লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং সমাজের সুবিধাভোগী উচ্চবিত্ত শ্রেণীর কপট চরিত্রকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। হাসতে হাসতে পাঠক যখন বইটির পাতা উল্টায়, তখনই সে মনের অজান্তে টের পায় যে এই আপাতনরম হাসির আড়ালে আসলে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক ক্ষোভ, রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও সত্য উন্মোচনের এক তীব্র ব্যাকুলতা।
আসহাব উদ্দীন আহমদের সাহিত্যচর্চার আরেকটি সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দিক হলো তাঁর ‘বিপ্লব বনাম অতিবিপ্লব’ শীর্ষক গ্রন্থটি। আজীবন বামপন্থী ও সাম্যবাদী আন্দোলনের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার সুবাদে তিনি এই ধারার রাজনীতির ভেতরের নানা সাংগঠনিক দুর্বলতা, অন্তহীন তাত্ত্বিক জটিলতা এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রবণতাকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ও চেনা রম্যরচনার ঢঙেই এই বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে অতিবিপ্লবী বা হঠকারী মনোভাব সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের মূল আন্দোলনকে বহু দূরে ঠেলে দেয় এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তির দেয়াল তৈরি করে। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভেতরে থেকেও এমন নির্মোহ, সৎ ও সাহসী সমালোচনা কেবল আসহাব উদ্দীন আহমদের মতো ব্যক্তিত্বের পক্ষেই করা সম্ভব ছিল, কারণ তিনি সাহিত্যের মাধ্যমে ক্ষমতার তোষামোদি বা অন্ধ স্তুতি চাননি। চেয়েছিলেন রূঢ় সত্যের নির্ভেজাল প্রকাশ। তাঁর এই চরম সৎ ও আপসহীন সাহিত্যচেতনা তাঁকে তৎকালীন সময়ের অন্য সব চাটুকার বা গতানুগতিক লেখক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও এক স্বতন্ত্র আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।
কেবল সমাজ বা রাজনীতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক রচনা নয়, ভ্রমণকাহিনী রচনার ক্ষেত্রেও তিনি বাংলা সাহিত্যে এক সম্পূর্ণ নতুন ও ভিন্ন ঘরানার জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ও বহুল পঠিত ভ্রমণকাহিনী ‘পায়ের তলায় সর্ষে’ কেবল কিছু দর্শনীয় স্থান, ঐতিহাসিক ইমারত কিংবা প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্যের গতানুগতিক বর্ণনা নয়; বরং তা ছিল বিভিন্ন দেশের সমাজব্যবস্থা, শাসনপদ্ধতি, সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম এবং সংস্কৃতির এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক দলিল। তিনি পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন, সেখানকার অভিজাত শ্রেণীর ড্রয়িংরুমে বন্দি না থেকে সরাসরি মিশে গিয়েছেন একদম সাধারণ মেহনতি মানুষের সাথে, আর তাঁদের জীবনের অন্তহীন সুখ-দুঃখ ও দীর্ঘশ্বাসকে করেছেন নিজের লেখার প্রধান উপজীব্য। তাঁর গদ্যের সাবলীলতা ও বর্ণনাকৌশল পাঠকের মনের ভেতর এমন এক জীবন্ত আবহ তৈরি করে। ফলে পাঠক নিজেকে আর দূরবর্তী কোনো দর্শক ভাবেন না, বরং মনে করেন তিনিও যেন লেখকের হাত ধরে সেই সুদূর ভ্রমণের একজন সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠেছেন। এছাড়া তাঁর ‘উপলব্ধি’, ‘উদ্ধার’, ‘জান ও মাল’, ‘সংস্কৃতি’ এবং ‘আমার কিছু বলা’ প্রভৃতি গ্রন্থগুলোতেও তাঁর গভীর জীবনদর্শন, সমাজ পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থার নানামুখী গলদ অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
শিক্ষকতা ছিল আসহাব উদ্দীন আহমদের ধমনিতে। তাই শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষকদের অধিকারের বিষয়টি তাঁর সাহিত্যের একটি বড় অংশ জুড়ে বিস্তার লাভ করেছিল। ‘ইস্ট বেঙ্গল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর মুখপত্র ‘দি টিচার’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ও অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সেই পত্রিকায় তিনি নিয়মিত শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে কলম ধরেছেন। তাঁর মতে, একজন মেরুদণ্ডহীন বা অভাবগ্রস্ত শিক্ষক কখনো একটি স্বাধীন ও উন্নত জাতি গঠন করতে পারেন না।
আসহাব উদ্দীন আহমদ নিজেকে ‘বোকা মিয়া’ অভিহিত করেছিলেন। এই ‘বোকা’ শব্দটি আসলে কোনো অজ্ঞতা বা নির্বুদ্ধিতার প্রতীক ছিল নয়। আধুনিককালের চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিক, অর্থলোভী ও পুঁজিবাদী সমাজের চোখে তাঁর হিমালয়সম সততা, নির্লোভ মানসিকতা ও অবিচল নীতিনিষ্ঠতার প্রতি এক ধরণের পরম সামাজিক স্বীকৃতি। তিনি এই ‘বোকা মিয়া’র চশমা বা চোখ দিয়েই চতুর, স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাবাদী সমাজকে দেখতেন এবং তাদের সব রকমের মুখোশ ও কপটতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল শক্তিই ছিল এর সর্বজনীন আবেদন। তিনি অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক তত্ত্ব, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা দর্শনের কঠিন বিষয়গুলোকে এমন সব সহজ-সরল উপমা ও চেনা রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, যা গ্রামের একজন নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদগ্ধ ও পণ্ডিত অধ্যাপক—সবার বুকেই সমানভাবে দাগ কাটত এবং সবাইকে সমানভাবে ভাবিয়ে তোলে ।
আসহাব উদ্দীন আহমদের ভাষা সহজ। তাঁর রসবোধ ছিল তীব্র ও মার্জিত। লেখালিখিতে তিনি সস্তা হাসির খোরাক জোগাতে রুচিহীন বা স্থূল কোনো শব্দের আশ্রয় নেননি। তাঁর প্রতিটি কৌতুক বা বিদ্রূপের পেছনে আছে একটি গভীর সামাজিক বার্তা। সমাজ যখন ধর্মের নামে ভণ্ডামি বা রাজনীতির নামে শোষণকে মেনে নিচ্ছিল, তখন তাঁর কলম গর্জে উঠেছিল শান্ত কিন্তু অমোঘ এক শক্তিতে। তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যে দোদুল্যমানতা, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’ টাইপের যে চরম স্বার্থপরতা—তাঁকে তীব্রভাবে ব্যথিত করত। আর এই ব্যথাই সাহিত্যিক রূপ লাভ করেছে তাঁর বিভিন্ন সমাজ সচেতনতামূলক রচনায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যিকদের কাজ কেবল কল্পনার জাল বোনা নয়, সমাজের ময়লা-আবর্জনাকে পরিষ্কার করার জন্য ঝাড়ুদারের ভূমিকা অবতীর্ণ হওয়া। তিনি নিজে সেই ভূমিকা পালন করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
১৯৯৪ সালে এই মহান ও প্রগতিশীল সাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর রেখে যাওয়া বিপুল ও বৈচিত্র্যময় সাহিত্যকর্ম আজও আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে নানাভাবে প্রাসঙ্গিক। এবং সমানভাবে উদ্দীপনামূলক। বর্তমান সময়ে যখন সমাজে মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় চলছে, চারদিকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, ক্ষমতার লোভ আর চাটুকারিতার সংস্কৃতি অত্যন্ত নগ্নভাবে জেঁকে বসেছে, তখন আসহাব উদ্দীন আহমদের সাহিত্যচর্চা আমাদের নতুন করে আত্মশুদ্ধি, মননশীলতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অদম্য প্রেরণা জোগায়।
তিনি তাঁর জীবন ও সাহিত্যের মাধ্যমে আমাদের এই পরম শিক্ষা দিয়ে গেছেন যে, কীভাবে ক্ষমতার সর্বোচ্চ চূড়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নিজের মুখে এক চিলতে মৃদু হাসি রেখে সবচেয়ে কঠিন ও রূঢ় সত্য কথাটি অত্যন্ত অবলীলায় বলে দেওয়া যায়। বাংলা সাহিত্যের সুদীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে তিনি চিরকাল এমন এক অনন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন, যাঁর ক্ষুরধার লেখনী সমাজকে কেবল প্রাণখুলে হাসার খোরাক যোগায়নি, সেই হাসির তীব্র আলোয় ভেতরের অন্ধকার ও কদর্য রূপটাকে চিনিয়ে দিয়ে মানুষকে প্রকৃত মানুষ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। শুষ্ক ও নীরস তত্ত্বের খোলস থেকে বের করে সাহিত্যকে কীভাবে অতি সহজে গণমানুষের প্রাণের ভাষা এবং প্রতিবাদের মূল হাতিয়ার করে তোলা যায়, আসহাব উদ্দীন আহমদের সমগ্র জীবনব্যাপী সাহিত্যসাধনা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তারই এক চির অম্লান ও অবিনশ্বর দলিল।
