দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে একটি নতুন খসড়া মডেল তৈরি করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনসহ প্রথাগত ৬টি বিষয়ের একক অনার্স (সম্মান) কোর্স বাতিল বা অন্য কোর্সের সাথে সমন্বয় করা হতে পারে।
প্রথাগত সার্টিফিকেট-সর্বস্ব ডিগ্রি থেকে বের হয়ে বাজারমুখী, প্রযুক্তি-নির্ভর ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার দিকে ধাবিত হওয়ার একটি বড় পদক্ষেপ এটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে নীতিগত আলোচনা চলছে। দেশের ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত বেকারত্ব সংকট দূর করতে এবং বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের সাথে শিক্ষার সরাসরি সংযোগ ঘটাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে শিক্ষাব্যবস্থা
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই মডেলে প্রথাগত মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের কিছু বিষয়ের আসন সংখ্যা ধাপে ধাপে কমানো হবে কিংবা একক ডিগ্রি হিসেবে এগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এর পরিবর্তে এই বিষয়গুলোকে অন্যান্য কোর্সের সাথে সম্পূরক মডিউল বা আংশিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর ফলে বেঁচে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ ও বরাদ্দ তথ্যপ্রযুক্তি (IT) এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
নতুন এই বিন্যাসে ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে:
- উদীয়মান প্রযুক্তি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার নিরাপত্তা এবং ডাটা অ্যানালিটিক্সের মতো বিষয়গুলোকে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের সাথে যুক্ত করা হবে।
- ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং: শিক্ষার্থীদের স্নাতক শেষ করার আগেই গ্লোবাল গিগ ইকোনমিতে যুক্ত করার জন্য কলেজ পর্যায়ে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ মডিউল চালু করা হবে।
- ভাষা ও আন্তর্জাতিক দক্ষতা: বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়াতে কলেজগুলোতে ‘ক্যারিয়ার সেন্টার’ স্থাপন এবং ৭টি আন্তর্জাতিক ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা হবে।
শিক্ষাব্যবস্থার এই পরিবর্তনের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রী আনম এহছানুল হক মিলন বারবার জোর দিয়ে বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ‘ডিগ্রি দেওয়ার কারখানা’ বানিয়ে না রেখে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে একটি বাস্তবসম্মত ও কর্মমুখী কর্মীবাহিনী গড়ে তোলার রাষ্ট্রীয় নির্দেশনার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা: উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার বেড়েছে ৮ গুণ
শিক্ষাব্যবস্থায় এই বড় ধরনের পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র। শিক্ষাবিদ ও শ্রম অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে, দেশের প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সাথে কর্মবাজারের চাহিদার কোনো মিল নেই। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের মধ্যে একটি বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৮ গুণ বেড়েছে। এর বিপরীতে, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রায় ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানই এখনও অনানুষ্ঠানিক (Informal) খাতের ওপর নির্ভরশীল—যেখানে প্রথাগত ডিগ্রির চেয়ে ব্যবহারিক ও কারিগরি দক্ষতাকে বেশি মূল্যায়ন করা হয়।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন
শিক্ষা ব্যবস্থার এই সংস্কার শুধু উচ্চশিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষা প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও সংক্ষিপ্ত করতে একটি সমান্তরাল কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)।
বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে ২৫ থেকে ৩০ কার্যদিবস এবং এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ৩৫ দিন বা তার বেশি সময় লেগে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এই দীর্ঘ সময়ে নিয়মিত পাঠদান বন্ধ থাকে, যা অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। একই সাথে দীর্ঘ পরীক্ষার সূচি পরীক্ষার্থীদের ওপর তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। এনসিটিবি’র নতুন প্রস্তাবে পরীক্ষার এই সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া, ২০২৮ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন শিক্ষাক্রমের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রী আনম এহছানুল হক মিলন নিশ্চিত করেছেন যে, চতুর্থ শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা ও সংস্কৃতির মতো বিশেষায়িত স্ট্রিমে যুক্ত হবে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ এবং বহুভাষী প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ‘আনন্দের সাথে শিক্ষা’ (Learning with Happiness) কাঠামো প্রবর্তন করা হবে।
প্রস্তাবিত এই কাঠামোগত খসড়াটি বর্তমানে পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে রাষ্ট্র এখন শুধু সনদধারী গ্র্যাজুয়েট তৈরির চেয়ে দক্ষ পেশাদার তৈরি করাকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
