দুই বছরে কোরবানিযোগ্য পশু কমেছে ৬.৪৬ লাখ, তবুও থাকবে ২২ লাখের বেশি উদ্বৃত্ত

দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা দুই বছরের ব্যবধানে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৭টি কমেছে, যা খাতসংশ্লিষ্টদের কাছে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি, সেখানে চলতি বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টিতে

রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, এ বছর কোরবানির জন্য সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশু। এর বিপরীতে দেশে প্রাপ্যতা রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, ফলে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে

তিনি আরও জানান, এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু-মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল-ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রাণী

উৎপাদন বাড়লেও বিক্রি কমছে

গত বছর কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি পশু, যার মধ্যে ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি পশু অবিক্রীত ছিল। এর আগে ২০২৩ সালে প্রস্তুত পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি এবং ২০২২ সালে ছিল ১ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৯টি

অন্যদিকে, করোনার আগে কোরবানির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও পরে তা কমে যায়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ পশু কোরবানি হলেও ২০২০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯৪ লাখ ৫০ হাজারে। ২০২১ সালে কোরবানি হয় ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২টি পশু, যেখানে প্রায় ২৮ লাখ পশু অবিক্রীত ছিল। গত বছর কোরবানি হয়েছে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু

খামারিদের উদ্বেগ

খামারিরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পশু পালন এখন অনেকটাই ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

চুয়াডাঙ্গার খামারি আব্দুর রহমান বলেন—

“রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দানাদার খাদ্যের দাম বেড়েছে।
এখনও বাড়তি দামেই খাদ্য কিনতে হচ্ছে।
তেলের দাম, শ্রমিক খরচ—সব মিলিয়ে খরচ বেড়েই চলছে।”

কুড়িগ্রামের কৃষক মাহফুজুল হক বলেন—

“বেশি দামে খাদ্য কিনে গরু পালন করে লাভ হচ্ছে না।
তাই গরু পালন ছেড়ে দিয়েছি।”

তথ্য সংগ্রহ ও হিসাব পদ্ধতি

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা স্তরায়িত দৈব নমুনা পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে এ হিসাব তৈরি করেছেন। প্রতিটি উপজেলার অন্তত ১ শতাংশ নমুনা নিয়ে এই পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন—

“কর্মকর্তারা ঘরে ঘরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে।”

বিশেষজ্ঞদের মত

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন—

“উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক খামারি লোকসানে পড়েছেন।
ফলে পশুর দাম বাড়ছে, আবার অনেক পশু অবিক্রীত থাকছে।
সরকারকে পশুখাদ্য ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে হবে।”

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব

পশুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও কোরবানিকে ঘিরে বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে বিশাল অর্থনৈতিক কার্যক্রম। কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়, যার প্রভাব পড়ে গ্রাম থেকে শহরের বাজার পর্যন্ত।

তুলনামূলকভাবে, পাকিস্তানে বছরে ৭০-৮০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৮ লাখ ৫৬ হাজার, তুরস্কে প্রায় ৩৮ লাখ এবং মিসরে প্রায় ১৩ লাখ পশু কোরবানি হয়

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতি একটি ‘সার্কুলার ইকোনমি’, যেখানে শহরের অর্থ গ্রামে প্রবাহিত হয়ে আবার নগরে ফিরে আসে। এই খাতে হাট ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, শ্রম, চামড়া প্রক্রিয়াকরণসহ বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

দুই বছরে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বিপুল পরিমাণ পশু অবিক্রীত থাকার প্রবণতা খাতের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতিসহায়তা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *