আজকের যুগে আমাদের কোনো কিছু জানতে ইচ্ছে হলে কি করি? পকেট থেকে ফোন বের করে সাথে সাথে গুগল সার্চ দিই। মুহূর্তেই হাজার হাজার রেজাল্ট আমাদের সামনে হাজির। এমনকি আপনি এই লেখাটিও পড়ছেন ইন্টারনেটের বদৌলতে। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, আমাদের বাবা-দাদারা বা তারও আগের প্রজন্ম কীভাবে তথ্য জানতেন? তখন তো কোনো স্মার্টফোন ছিল না, ছিল না কোনো ওয়াইফাই।
এই প্রশ্ন কি কখনো মনে উঁকি দিয়েছিলো? চলুন আজ একটু সেই “অফলাইন” দিনগুলোতে ফিরে যাই।
আদিম ‘সার্চ ইঞ্জিন’: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা
আমরা যখন ইন্টারনেটের আগের যুগের কথা বলি, তখন সবার আগে যে নামটি আসে তা হলো ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’ (Encyclopaedia Britannica)। আপনি জানলে অবাক হবেন, আজকের উইকিপিডিয়ার এই পূর্বপুরুষের যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে ২৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে।
ঐতিহাসিকভাবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ছিল প্রথম কোনো সুসংগঠিত ইংরেজি বিশ্বকোষ যা সরাসরি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা লেখা হয়েছিল। এর পরিকল্পনা ও মুদ্রণ প্রস্তুতি ১৭৬৭ সাল থেকে শুরু হলেও, ১৭৬৮ থেকে ১৭৭১ সালের মধ্যে এর প্রথম সংস্করণটি স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় তিনটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়। ২,৩৯১টি পৃষ্ঠার এই সংকলনে তৎকালীন বিশ্বের যাবতীয় ভৌগোলিক, বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক তথ্য স্থান পেয়েছিল।
এটি ছিল কেবল কিছু বইয়ের সংকলন নয়, বরং মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ অর্জনের এক দালিলিক রূপ। কলিন ম্যাকফারকুহার এবং অ্যান্ড্রু বেলের উদ্যোগে প্রকাশিত এই সংকলনটি তৎকালীন সময়ে তথ্যের অভাব মেটানোর এক অভাবনীয় হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
এনসাইক্লোপিডিয়া বা বিশ্বকোষের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর তথ্যের বিশুদ্ধতা। আজকের ইন্টারনেটের মতো তখন যে কেউ চাইলেই কোনো তথ্য যোগ করতে পারত না। ব্রিটানিকার প্রতিটি প্রবন্ধ লেখার জন্য বিশেষজ্ঞ ও প্রথিতযশা লেখকদের দায়িত্ব দেওয়া হতো।
উদাহরণস্বরূপ, বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইন্সটাইন, মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড এবং প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি পরবর্তী সংস্করণগুলোতে সরাসরি নিবন্ধ লিখেছেন। একটি তথ্য বইয়ে স্থান পাওয়ার আগে কয়েক স্তরের সম্পাদনা প্যানেলের মধ্য দিয়ে যেত, যার ফলে তখনকার দিনে এনসাইক্লোপিডিয়াকে ‘চূড়ান্ত সত্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এনসাইক্লোপিডিয়া নিজের বুকশেলফে রাখা ছিল আভিজাত্য এবং সচেতনতার প্রতীক। তখন সেলসম্যানরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই বিশাল বইয়ের সেটগুলো কিস্তিতে বিক্রি করতেন। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বছরের পর বছর টাকা জমিয়ে এই সেটগুলো কিনত, যাতে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ঘরে বসেই পুরো পৃথিবীর ইতিহাস, বিজ্ঞান ও ভূগোল জানতে পারে। এছাড়া লাইব্রেরিতে গিয়ে হাজার হাজার বইয়ের মাঝে তথ্য খুঁজতে ব্যবহৃত হতো ‘কার্ড ক্যাটালগ’ পদ্ধতি। তখনকার মানুষের কাছে তথ্য পাওয়া মানে ছিল এক দীর্ঘ গবেষণার সফল সমাপ্তি।
দীর্ঘ ২৪৪ বছর ধরে দাপটের সাথে পৃথিবীকে জ্ঞান দান করার পর, ২০১২ সালের মার্চ মাসে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা তাদের সর্বশেষ ছাপানো সংস্করণটি প্রকাশ করে। এটি ছিল ৩২ খণ্ডের ১৫তম সংস্করণ। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে তারা এখন আর বই ছাপে না, বরং সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের তথ্য সরবরাহ করছে। এই রূপান্তর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাধ্যম বদলালেও মানুষের তথ্য জানার তৃষ্ণা চিরন্তন।
প্রযুক্তি আমাদের গতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সময়কার ধৈর্য ও তথ্যের নির্ভুলতা আজও আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। মাধ্যম বদলালেও মানুষের অজানাকে জানার এই চিরন্তন তৃষ্ণা যুগে যুগে একইভাবে টিকে থাকবে।
