বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে ১৭ এপ্রিল এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (বর্তমান মুজিবনগর) স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে এই সরকার গঠিত হয়। এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করার মধ্য দিয়ে একটি সুশৃঙ্খল সশস্ত্র যুদ্ধের রূপরেখা তৈরি হয়। মূলত ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও ১৭ এপ্রিলের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আইনি ভিত্তি এবং সার্বভৌম অস্তিত্বকে সুসংহত করে।
মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। তবে এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সমান্তরালে সরকার পরিচালনা, অভ্যন্তরীণ কৌশল এবং নীতিনির্ধারণী বিষয় নিয়ে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মহলে কিছু গভীর বিতর্ক ও আলোচনা বিদ্যমান।
নেতৃত্ব ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব
মুজিবনগর সরকারের ভেতরে সবচেয়ে আলোচিত বিতর্ক ছিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক সংঘাত। অভিযোগ রয়েছে, মোশতাক প্রধানমন্ত্রীকে না জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি ‘কনফেডারেশন’ গঠনের গোপন চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ণ স্বাধীনতার পরিবর্তে স্বায়ত্তশাসন মেনে নেওয়া। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমদ ক্ষুব্ধ হন এবং মোশতাককে জাতিসংঘে পাঠানো প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেন।
মুজিব বাহিনী ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন
সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও আওয়ামী লীগের ভেতরে গভীর বিভাজন ছিল। শেখ ফজলুল হক মণি ও অন্য যুবনেতারা শুরুতে তাজউদ্দীনের নেতৃত্ব মেনে নিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। তাদের দাবি ছিল, শেখ মুজিবুর রহমান কাউকে একক দায়িত্ব দিয়ে যাননি। এই বিরোধের জের ধরে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি ভারতের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সহায়তায় পৃথকভাবে ‘মুজিব বাহিনী’ (বিএলএফ) গঠন করা হয়, যা অনেক সময় মুজিবনগর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
জাতীয় ঐক্য ও সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি
যুদ্ধ পরিচালনায় জাতীয় ঐক্য গড়া নিয়ে শুরুর দিকে বিতর্ক তৈরি হয়। মওলানা ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মতো প্রবীণ নেতারা একটি ‘সর্বদলীয় জাতীয় সরকার’ গঠনের দাবি জানিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ এককভাবে সরকার গঠন করায় তৈরি হওয়া এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ঘোচাতে পরবর্তীতে ৮ সেপ্টেম্বর মওলানা ভাসানীকে প্রধান করে ৮ সদস্যের একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়।
চুক্তির গুজব ও পরিচালনার স্থান
সে সময় তাজউদ্দীন আহমদ ও ভারত সরকারের মধ্যে একটি ‘৭-দফা চুক্তি’ নিয়ে ব্যাপক গুজব ছড়ায়, যেখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। তবে মূলধারার ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ছিল মূলত প্রবাসী সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য বিরোধীদের অপপ্রচার। এছাড়া সরকারের দাপ্তরিক কাজ ভারতের কলকাতা থেকে পরিচালিত হওয়া এবং মেহেরপুর সীমান্তের একদম কাছে শপথ গ্রহণের বিষয়টি নিয়েও কোনো কোনো সমালোচক ভারতের অতিরিক্ত প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করেন।
নানা বিতর্ক, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্য ছিল অনস্বীকার্য। এই সরকারের নেতৃত্বেই বিশ্ব জনমত গঠন এবং একটি সশস্ত্র জনযুদ্ধকে বিজয়ের বন্দরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। বর্তমান সময়ে ১০ বা ১৭ এপ্রিলকে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জোরালো হচ্ছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দিনটির গুরুত্বকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসছে।
