ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬: আমানতকারীর সুরক্ষা নাকি পুরোনো মালিকদের পুনর্বাসন?

দেশের টালমাটাল ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’। গত ১০ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি সংসদে উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। তবে এই নতুন আইন নিয়ে জনমনে যেমন আশার সঞ্চার হয়েছে, তেমনি কিছু বিতর্কিত ধারা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। বিশেষ করে ২০২৫ সালের কঠোর অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন আইনে নমনীয়তা এবং বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা যুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

১৮(ক) ধারা: মালিকানায় ফেরার নতুন সুযোগ?

নতুন আইনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা। ২০২৫ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা অধ্যাদেশে ব্যাংক লুটপাট বা অব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত মালিকদের ফেরার পথ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের আইনে একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এখন থেকে সংকটাপন্ন ব্যাংকের পুরোনো মালিকরা মাত্র ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম অর্থ জমা দিয়ে এবং সরকারের পাওনা পরিশোধের অঙ্গীকারনামা দিয়ে পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে এস আলম বা নাসা গ্রুপের মতো বড় মালিকরা আবারও ব্যাংক ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পেতে পারেন।

৪০ হাজার কোটি টাকার বিশাল সুরক্ষা তহবিল

আইনটির একটি ইতিবাচক দিক হলো ‘ব্যাংক রেজল্যুশন ফান্ড’ গঠন। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল তহবিল ব্যাংকগুলোর নিজস্ব কন্ট্রিবিউশনে তৈরি করা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়লে সরকারকে আর রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে টাকা দিয়ে ব্যাংক বাঁচাতে হবে না। এই তহবিল থেকে আমানতকারীদের টাকা দ্রুত পরিশোধ করা সম্ভব হবে, যা সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি যোগাবে।

নমনীয় হয়েছে আইনি কাঠামো

২০২৫ সালের অধ্যাদেশে মোট ৯৮টি কঠোর ধারা ছিল, যা মূলত অপরাধীদের দমনে ফোকাস করেছিল। তবে চূড়ান্ত আইনে ধারার সংখ্যা কমিয়ে ৭৫টিতে আনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর মতে, আইনটিকে আরও বাজারমুখী এবং কার্যকর করতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, অনেক কঠোর শর্ত শিথিল করার ফলে প্রভাবশালী খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতে পারে।

ব্যাংক বন্ধের সুযোগ আর থাকছে না

আগের আইনে কোনো ব্যাংক চাইলে নিজে থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া বা ‘স্বেচ্ছায় অবসায়নের’ সুযোগ পেত। কিন্তু নতুন আইনে এই সুযোগটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে কোনো ব্যাংক চাইলেই বন্ধ হতে পারবে না; সেই সিদ্ধান্ত নেবে একমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সাথে একীভূতকরণ (Merger) বা পুনর্গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আমানতকারীর সুরক্ষা কতটুকু?

নতুন এই আইনের মূল লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। ‘আমানত সুরক্ষা আইন’ এর অধীনে এখন ব্যাংক সংকটে পড়লেও গ্রাহকরা আগের চেয়ে দ্রুত টাকা ফেরত পাবেন। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের বোদ্ধারা মনে করছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং তদারকি জোরদার না হবে, ততক্ষণ শুধু আইন দিয়ে খাতের সংস্কার সম্ভব নয়।

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬ পাস হওয়ার মাধ্যমে দেশের আর্থিক খাতে একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো তৈরি হলো। তবে বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা এবং মালিকদের পুনর্বাসনের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের স্বার্থ কতটা রক্ষা করবে, তা সময়ই বলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *