জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে বাংলা নববর্ষ: কেমন ছিল অবরুদ্ধ সেই বৈশাখ?

১৩৭৮ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল, ১৯৭১)। পঞ্জিকার পাতায় নতুন বছর এলেও বাঙালির জীবনে তখন কেবলই রক্ত আর হাহাকারের কালবেলা। ২৫শে মার্চের কালরাত্রির বীভৎসতা কাটিয়ে ঢাকা তখন এক থমথমে শহর। চারিদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বুটের আওয়াজ আর বেয়নেটের ঝিলিক। এমনই এক বৈরী সময়ে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ কীভাবে পালিত হয়েছিল, তার এক জীবন্ত দলিল হয়ে আছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ডায়েরি ‘একাত্তরের দিনগুলি’।

জাহানারা ইমাম তার ডায়েরিতে ১৩৭৮-এর ১লা বৈশাখের বর্ণনায় লিখেছেন, সে সময় সরকারিভাবে ছুটি বাতিল করা হয়েছিল। সামরিক ফরমান জারির মাধ্যমে মানুষের আনন্দ প্রকাশের পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তৎকালীন সংবাদপত্রে পহেলা বৈশাখের কথা উল্লেখ না করে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল— যেখানে জানানো হয়, জরুরি অবস্থার কারণে প্রাদেশিক সরকারের নির্ধারিত ছুটি বাতিল করা হয়েছে। জাহানারা ইমাম লিখেছেন, “আজ পয়লা বৈশাখ। সরকারি ছুটি বাতিল হয়ে গেছে। পয়লা বৈশাখের উল্লেখমাত্র না করে কাগজে বক্স করে ছাপানো হয়েছে: আজ বৃহস্পতিবার প্রাদেশিক সরকারের যে ছুটি ছিল, জরুরি অবস্থার দরুন তা বাতিল করা হয়েছে।”

সে সময় রাস্তায় কোনো বৈশাখী মেলা ছিল না, ছিল না ছায়ানটের সেই চিরচেনা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। পুরো শহর যেন এক বিশাল গোরস্তান। তবুও বাঙালির মন থেকে উৎসবের চেতনা মুছে ফেলতে পারেনি দখলদার বাহিনী। জাহানারা ইমামের লেখনীতে সেই দৃঢ় চেতনার প্রকাশ পায় এভাবে— “পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা শহরে এবং দেশের সর্বত্র বর্ষবরণ অনুষ্ঠানও বন্ধ। কিন্তু সে তো বাইরে। ঘরের ভেতরে, বুকের ভেতরে কে বন্ধ করতে পারে?”

অবরুদ্ধ সেই পরিস্থিতিতেও অনেক বাঙালি পরিবার ঘরের কোণে অতি গোপনে একটু বিশেষ আয়োজনের চেষ্টা করেছিল। জাহানারা ইমামের বাড়িতে ওইদিন বিকেলে কয়েকজন বন্ধু ও আত্মীয়ের সমাগম হয়েছিল। তবে সেই আড্ডায় নতুন বছরের আনন্দ নয়, বরং ছিল যুদ্ধের অনিশ্চয়তা আর চারপাশের বিভীষিকার আলোচনা।

সেদিন রমনা বটমূলে গান হয়নি সত্য, কিন্তু বাংলার আকাশে বাতাসে তখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল প্রতিরোধের গান। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র বিশ দিনের মাথায় আসা সেই নববর্ষে বাঙালির একমাত্র সংকল্প ছিল শত্রু মুক্ত এক নতুন ভোরের। জাহানারা ইমামের বড় ছেলে শফি ইমাম রুমী তখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, শরীফ ইমাম দুশ্চিন্তায় মগ্ন— এই পারিবারিক আবহের মাঝেই ফুটে ওঠে পুরো বাংলাদেশের চিত্র।

৭১-এর নববর্ষ আমাদের শিখিয়েছে, উৎসব কেবল আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির প্রতিরোধের ভাষা। জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ আমাদের সেই অবরুদ্ধ বৈশাখের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে হার না মানা বাঙালির বুকের ভেতরে উৎসবের আগুন জ্বলেছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা হয়ে। ৫৩ বছর পর আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সেই বিষণ্ণ বৈশাখ আমাদের ঐতিহ্যের শেকড়কে আরও গভীরে নিয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *