বাংলার দিগন্তজোড়া মাঠে এখন সোনালী ধানের সমারোহ। দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেওয়া বোরো ধান কাটার এই মৌসুম মানেই গ্রামবাংলায় উৎসবের আমেজ থাকার কথা। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এবং কৃষিযন্ত্রের বিকল দশায় সেই উৎসব এখন কৃষকের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহে ঘাটতি বোরো চাষিদের ঠেলে দিয়েছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
জ্বালানি নির্ভর কৃষি: পাঁচ ধাপে ডিজেলের সংকট
বর্তমানে দেশের কৃষি ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি যান্ত্রিক ও জ্বালানি নির্ভর। জমি চাষ থেকে শুরু করে সেচ, ধান কাটা, মাড়াই এবং পরিবহন—এই পাঁচটি ধাপেই ডিজেল অপরিহার্য। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ২১ লাখ ৩১ হাজার ৩০৯টি ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে শুধু সেচ মৌসুমেই (ডিসেম্বর থেকে মে) ডিজেলের চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন।
তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের চিত্রটি বেশ হতাশাজনক। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী:
- বার্ষিক ডিজেল চাহিদা: প্রায় ৪৫ লাখ টন।
- বর্তমান মজুত: ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ টন।
- দৈনিক ঘাটতি: দৈনিক ১২ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে সাড়ে ১১ হাজার টন।
এই সামান্য ঘাটতিই মাঠ পর্যায়ে কৃষকের ওপর পাহাড়সম চাপ সৃষ্টি করছে।
বাজারে অস্থিরতা ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি
সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। কিশোরগঞ্জের ইটনার কৃষক আব্দুল ওয়াদুদ জানান, ১০৩ টাকার ডিজেল তাঁকে কিনতে হচ্ছে ১৩০ টাকায়। শ্রমিক সংকটের কারণে যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও জ্বালানির এই উচ্চমূল্য উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
একই চিত্র দেখা গেছে কুষ্টিয়ার খোকসায়। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে ‘ডিজেলের স্লিপ’ নিয়েও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পাচ্ছেন না কৃষকরা। পাম্পগুলোতে মজুত থাকলেও তা সাধারণ কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
যন্ত্র সংকট ও হাওরাঞ্চলের চ্যালেঞ্জ
দেশের বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। পাহাড়ি ঢল বা অকাল বৃষ্টির ঝুঁকি থাকায় এখানে দ্রুত ধান কাটা জরুরি। কিন্তু এবার যান্ত্রিক সংকটে সেই গতি থমকে গেছে।
- হারভেস্টার সংকট: হাওরাঞ্চলে দ্রুত ধান কাটার জন্য অন্তত সাড়ে ৭ হাজার কম্বাইন হারভেস্টার প্রয়োজন হলেও সচল আছে মাত্র ২ হাজার ৯৩০টি।
- অচল যন্ত্র: প্রায় ৪৪৫টি হারভেস্টার মেরামতের অভাবে অচল হয়ে পড়ে আছে।
- ভর্তুকি বন্ধ: গত দুই বছর ধরে কৃষিযন্ত্রে নতুন কোনো ভর্তুকি না দেওয়ায় বাজারে নতুন যন্ত্র আসেনি এবং খুচরা যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে কয়েক গুণ।
খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকির শঙ্কা
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, ১৮ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা সরাসরি বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “জ্বালানি সংকটের কারণে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়বে।”
কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ এবং কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন যে, অচল হারভেস্টারগুলো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উৎসবের বোরো ধান শেষ পর্যন্ত কৃষকের চোখের জল হয়ে দাঁড়াবে।
