আজ ভোরের আলো ফোটার আগেই চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে বিজিবির হাতে আটক হলেন তিনজন নারী, দুইজন পুরুষ এবং পাঁচটি শিশু। রবিবার ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে বারাদি বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা সীমান্তের অভ্যন্তরে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাদের আটক করেন। আটকদের পরিচয় যাচাই চলছে, শিগগিরই তাদের দর্শনা থানায় সোপর্দ করা হবে বলে বিজিবি জানিয়েছে।
কিন্তু এই খবরের পেছনে যে প্রশ্নটি উঠে আসছে, সেটি কেবল আইনি নয়—মানবিকও। ওই পরিবারগুলো কোথা থেকে এলেন? কেন এলেন? আর কেনই বা এই সময়ে?
পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের হাওয়া, মুসলিমদের কপালে শনির দশা
গত এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দীর্ঘ তৃণমূল যুগের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করেছে বিজেপি। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর বিজেপির মন্ত্রী অগ্নিমিত্র পাল মন্তব্য করেছেন, রাজ্যটি ‘পশ্চিম বাংলাদেশ’ হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। এই একটি মন্তব্যই বলে দেয়, পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ নতুন শাসনে কতটা নিরাপদ বোধ করছেন।
নির্বাচনের আগে থেকেই বিজেপি অভিযোগ করে আসছিল যে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করা হয়েছে। ২৭ লাখ মানুষ তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়েছে। বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয়ের পর সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, মসজিদ, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, নারী নির্যাতন এবং বিভিন্ন স্থানে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন।
ঈদের আগেই যুক্ত হয়েছে আরেক উপদ্রব। নতুন বিজেপি সরকারের প্রজ্ঞাপন জারির পর হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী এবং পুলিশ রাস্তায় গবাদিপশু পরিবহনকারীদের থামিয়ে হয়রানি করছে। বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র একটি গরুর ট্রাক থামিয়ে ‘জন্ম সনদ’ দাবি করেছেন। কোরবানির গরু কিনতে না পেরে বহু মুসলিম পরিবার ঈদ পার করেছেন নিরানন্দে।
‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে ঠেলে দেওয়ার রাজনীতি
নতুন সরকারের ছত্রছায়ায় পশ্চিমবঙ্গে এখন মুসলিম মানেই ‘সন্দেহভাজন’। শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণা, ‘অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে’। কিন্তু এই ‘অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্তের মানদণ্ড যখন হয়ে ওঠে ধর্মীয় পরিচয়, তখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমরাও পড়ছেন অনিশ্চয়তায়।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুসরণ করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের প্রতিটি জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেখানে ‘অবৈধ অভিবাসী’ সন্দেহে আটক করা হবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এতে নাগরিকত্ব যাচাইয়ে জটিলতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শঙ্কা দেখছে।
বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেছেন, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের বাংলাদেশকেন্দ্রিক মন্তব্যগুলো ছিল দুঃখজনক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।
ভয়ের মানুষ, ভাঙা পরিবার
দর্শনা সীমান্তে আজ যে পাঁচটি শিশু আটক হয়েছে, তারা কোনো অপরাধী নয়। তারা সম্ভবত সেই লাখো মানুষের সন্তান, যারা ওপারে ভিটে-বাড়ি রেখে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। হয়তো পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, হয়তো ভিটে হারানোর ভয়ে পথে নেমেছেন মা তার সন্তানকে বুকে নিয়ে।
ভারতে যে ‘ইসলামোফোবিয়া’ মুসলমান সমাজকে ভোগ করতে হচ্ছে, তার একটি প্রতিফলন এখন পশ্চিমবঙ্গেও দেখা যাচ্ছে। কোনো রাজনৈতিক দলই সরাসরি এর বিরোধিতা করছে না, কারণ সবাই হিন্দু ভোট হারানোর ভয়ে ভীত।
বাংলাদেশ এই মানুষগুলোকে গ্রহণ করতে পারে না কারণ তারা বাংলাদেশের নাগরিক নয়। ভারত তাদের রাখতে চাইছে না কারণ তারা মুসলিম। দুই দেশের সীমান্তে আটকে থাকা এই পরিবারগুলোর জন্য আদৌ কোনো মানবিক সমাধান আছে কি?
