প্রতি বছর পঁচিশে বৈশাখ আসে। বাংলাদেশের চারুকলায় ভিড় জমে, সাদা শাড়িতে লাল পাড় উড়তে থাকে, রবীন্দ্রসংগীত ভেসে বেড়ায় বাতাসে। আমরা গাই, আমরা আনন্দ করি, আমরা তাঁকে “আমাদের কবি” বলি। কিন্তু একটু থামা দরকার। একটু ভাবা দরকার।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির সবচেয়ে উর্বর মাটি ছিল এই বাংলাদেশে। কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, নওগাঁর পতিসর — এই তিনটি জায়গায় তিনি জমিদারি করেছেন, নৌকায় পদ্মায় ভেসেছেন, কৃষকের দুঃখ দেখেছেন, আর লিখেছেন। লিখেছেন এমন সব কবিতা ও গল্প যা তাঁকে নোবেল পুরস্কার পর্যন্ত নিয়ে গেছে।
অথচ শান্তিনিকেতন আজ ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। আর শিলাইদহ?
বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের তিন আস্তানা
যেখানে জমিদার এসেছিলেন খাজনা আদায় করতে, কিন্তু রেখে গেলেন সাহিত্যের ভাণ্ডার
প্রায় এক দশক, অনিয়মিত বিরতিতে
শেষ সফর ১৯০১ সালে
শেষ সফর ১৯৩৭ সালে
রবীন্দ্রনাথের সেরা সৃষ্টি এই মাটিতেই জন্মেছিল।
নোবেল পুরস্কারের মূলে ছিল বাংলাদেশের মাটি
১৯১৩ সাল। এশিয়ার প্রথম নোবেল সাহিত্য পুরস্কার এলো একজন বাঙালির ঘরে। সেই বাঙালি তখন পর্যন্ত যা লিখেছেন তার সেরাটা লিখেছেন এই বাংলাদেশে বসে।
শিলাইদহে আসার পর রবীন্দ্রনাথের কবিতা বদলে গেল। কলকাতার অভিজাত সাহিত্যের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এলো নদী, মাঠ, বৃষ্টি, কৃষকের মুখ। গবেষকরা যাকে তাঁর সবচেয়ে সৃষ্টিশীল পর্ব বলেন — ১৮৯১ থেকে ১৮৯৫ — সেই পুরো সময়টা কেটেছে এই পূর্ববঙ্গে।
আর লালন? শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়েছিল গগন হরকরার সঙ্গে — স্থানীয় ডাকঘরের এক কর্মী, যিনি বাউল গানও গাইতেন। গগনের মাধ্যমে তাঁর কাছে পৌঁছাল লালন শাহের গানের জগৎ। লালন মারা গিয়েছিলেন ১৮৯০ সালে — রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে আসার ঠিক এক বছর আগে। দুজনের সরাসরি সাক্ষাতের কোনো দলিল নেই। লালনের সেই মরমি সুর রবীন্দ্রনাথের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই। রবীন্দ্রসংগীতের যে দেশজ-আধ্যাত্মিক টান — তার শিকড় কুষ্টিয়ায়, কলকাতায় নয়।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই লালনের গান সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছিলেন। পশ্চিমা বিদ্বৎসমাজ যখন গীতাঞ্জলি পড়ে অবাক হয়েছিল — সেই গভীরতার একটা বড় উৎস ছিল এই বাংলার নদী, মাঠ, আর লালনের ভাববাদ।
শান্তিনিকেতন বনাম শিলাইদহ: গৌরবের ব্যবধান
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী বানিয়েছেন — এটা সত্য। কিন্তু শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরে তিনি তাঁর সেরা সাহিত্যকর্মের বড় অংশ লিখেছেন — এটাও সত্য। তাহলে স্বীকৃতির এত ফারাক কেন?
২০২৩ সালে শান্তিনিকেতন পেয়েছে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তকমা। বার্ষিক লক্ষাধিক পর্যটক যায়। রাজ্য সরকারের আলাদা বাজেট।
আর শিলাইদহ? প্রবেশমূল্য দশ টাকা। সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ। আন্তর্জাতিক পর্যটকের দেখা নেই বললেই চলে। ইউনেসকোর কাছে আবেদন করার কথা কেউ ভাবেওনি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শিলাইদহ থেকে টিকিট বিক্রির আয় ছিল মাত্র ৪৬ লাখ টাকা। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায় এর চেয়ে বেশি আয় হয় একটি দিনেই।
আর শাহজাদপুরে? কাছারিবাড়ির মূল ভবনটি — যেখানে রবীন্দ্রনাথ জমিদারি পরিচালনা করতেন — এতটাই জরাজীর্ণ যে দেয়ালে ফাটল ধরেছে, দরজা-জানালা নষ্ট। মেরামতির আবেদন পড়ে আছে। পতিসরে যে মাটিতে নোবেলের পুরো অর্থ ঢেলেছিলেন — সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যটক পৌঁছায় না বললেই চলে।
রবীন্দ্রনাথ নিজের সেরাটা দিয়েছিলেন এই মাটিকে।
বাংলাদেশ কি রবীন্দ্রনাথকে পুরোপুরি দাবি করতে পারে?
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান, জমিদার, এলিট কলকাত্তাই বাঙালি। তাঁর জমিদারিতে যে কৃষকরা খাজনা দিত — তাদের বেশিরভাগই ছিল এই অঞ্চলের মুসলমান। সম্পর্কটা কবি-পাঠকের ছিল না। জমিদার-প্রজার ছিল। ইতিহাসের সেই অস্বস্তিকর সত্যটাও মাথায় রাখা দরকার।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ব্যতিক্রমী জমিদার ছিলেন। পতিসরে তিনি কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন — শুধু কবিতায় নয়, কাজেও। আর সেই কৃষকের মুখ, সেই নদীর রূপ, সেই মাঠের গন্ধ — সেটাই ফুটে উঠেছে পোস্টমাস্টারে, ছুটিতে, দেনা-পাওনায়। তাই পতিসরের কৃষকরা আজও প্রতি মে মাসে তাঁকে স্মরণ করতে একত্রিত হন। প্রজারা জমিদারকে এভাবে মনে রাখে — ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল।
আর একটা কথা। “আমার সোনার বাংলা” গানটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে। এই গানের কিছু অংশ লেখা শিলাইদহের স্মৃতি থেকে। সেই গানই আজ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।
বাংলাদেশের মাটিতে বসে, বাংলাদেশের নদীর ছন্দে লেখা গান — বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। এর চেয়ে গভীর সম্পর্ক আর কী হতে পারে?
রবীন্দ্রনাথকে ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে
২০১৭ সালে শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। ২০২০ সালে শিলাইদহে নতুন কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।
দরকার সাংস্কৃতিক কূটনীতি। দরকার পর্যটন পরিকাঠামো। দরকার ইউনেসকোর দরজায় কড়া নাড়ার সাহস। আর সবচেয়ে বেশি দরকার — নিজেদের মনে মনে বিশ্বাস করা যে রবীন্দ্রনাথ শুধু ভারতের সম্পদ নন।
শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের ঘর। কিন্তু শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ছিল তাঁর সৃষ্টির ঘর। সোনার তরী এই পদ্মায় ভেসেছিল। গীতাঞ্জলির অনুবাদ শুরু হয়েছিল এই মাটিতে বসে। লালনের সুর তাঁর কবিতায় ঢুকেছিল এখানেই।
রবীন্দ্রনাথ শুধু ভারতের কবি নন। রবীন্দ্রনাথ এই মাটিরও কবি।
