নজরুলের যেই কণ্ঠ থামাতে পারেনি ব্রিটিশরা, তা থেমে গিয়েছিলো এক বিরল রোগে

আজ ২৪ মে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মদিন।

তিনি বেঁচেছিলেন ৭৭ বছর। কিন্তু স্বাভাবিক জীবন কাটিয়েছেন মাত্র ৪৩ বছর পর্যন্ত। আর সাহিত্য রচনার কাল ছিল মাত্র ২৪ বছর। এই ২৪ বছরেই একটি সাম্রাজ্য তাঁকে থামানোর চেষ্টা করেছে। পারেনি। তিনি বলেছিলেন, “থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।”

কবি যখন সৈনিক

অনেকেই জানেন না, তিনি একসময় সত্যিকারের সৈনিক ছিলেন, ব্রিটিশ বাহিনীর। ১৯১৭ সালে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন, করাচি সেনানিবাসে যান এবং সাধারণ কর্পোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন। ইরাকে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আর হয়নি।

আসল চমকটা এখানেই। সেই করাচি সেনানিবাসে বসেই তিনি তাঁর প্রথম গদ্য রচনা “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী” লেখেন, যা ১৯১৯ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন কলম ধরেছিলেন, সেই ব্রিটিশের সেনানিবাসে বসেই তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরু। এই irony-টা ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে, কিন্তু জানা নেই অনেকের।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কবি নজরুল

সেনানিবাস ছেড়ে ফেরার পর তিনি কলম তুললেন। আর সেই কলমই হয়ে উঠল ব্রিটিশের মাথাব্যথার কারণ। তাঁর প্রথম নিষিদ্ধ বই ‘যুগবাণী’ ১৯২২ সালে বাজেয়াপ্ত হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বইটিকে “ভয়ংকর” বলে চিহ্নিত করা হয়। এরপর একে একে নিষিদ্ধ হয় ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয়-শিখা’, ‘চন্দ্রবিন্দু’। মোট পাঁচটি গ্রন্থ নিষিদ্ধ হলেও নজরে ছিল দশটি। ২৫টি গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়নি। নয়টি বইয়ের প্রকাশক তিনি নিজেই , কারণ অন্য কেউ দায়িত্ব নিতে রাজি ছিল না।

জেলে গেলেও কলম থামেনি। বরং জেলে থাকার সময়ই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য তাঁকে উৎসর্গ করেন, আর সেই আনন্দে জেলে বসেই তিনি লেখেন “আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।” চার দেওয়ালের ভেতরে বসে “সৃষ্টি সুখের উল্লাস”। এটাই তাঁর পুরো জীবনের সারকথা।

এরপর আসে সেই মুহূর্ত যা ইতিহাস ভুলে গেছে। ১৯২৩ সালে হুগলি জেলে বন্দি অবস্থায় তিনি জেল-সুপারের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে একটানা চল্লিশ দিনের অনশন ধর্মঘট করেন। খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম করেন: “Give up hunger strike, our literature claims you।” কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ সেই টেলিগ্রাম পৌঁছে দেয়নি। রবীন্দ্রনাথ ডাকছেন, আর তিনি জানছেনই না। এর চেয়ে হৃদয়বিদারক ইতিহাসে কমই আছে।

যা পারেনি ব্রিটিশরা, তা পেরেছিল একটি রোগ

১৯৪০ সালে স্ত্রী প্রমীলা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলে তিনি তাঁর গাড়ি, জমি, বইয়ের কপিরাইট, গানের রয়্যালটি সব বিক্রি করে দেন স্ত্রীর চিকিৎসায়। আর ঠিক এই মানসিক ভাঙনের মাঝেই ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই রাতে রেডিও স্টুডিওতে হঠাৎ তাঁর ঠোঁট কেঁপে ওঠে, জিভ আড়ষ্ট হয়, তীব্র চেষ্টা করেও কোনো কথা বলতে পারেন না।

ভিয়েনা থেকে জানানো হয়, সম্ভবত তিনি “পিক’স ডিজিজ”-এ আক্রান্ত এমন একটি রোগ যেখানে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়, আজও যার কোনো চিকিৎসা নেই। সেই ১৯৪২ থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যু পর্যন্ত, দীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নির্বাক।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ঢাকায় নিয়ে আসে। কিন্তু তিনি তখন কাউকে চেনেন না, কিছু বোঝেন না।

“আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে।”

এই লাইনটা যিনি লিখেছিলেন, শেষ জীবনে তিনি নিজেই সবকিছু ভুলে গিয়েছিলেন — চিনতে পারতেন না কাউকে, বুঝতে পারতেন না কিছু। একটা সাম্রাজ্য যাঁকে ভয় পেয়েছিল, তাঁকে শেষ পর্যন্ত থামিয়ে দিয়েছিল একটা নিরব রোগ।

জন্মদিনে আমরা তাঁকে স্মরণ করি স্রদ্ধার সাথে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *