রক্তস্নাত পঞ্জিকায় নতুন সূর্যের উদয়: স্বাধীন বাংলার প্রথম নববর্ষ

১৩৭৯ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল, ১৯৭২)। ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটা কেবল একটি নতুন বছরের সূচনা ছিল না, বরং তা ছিল সহস্র বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এক মহিমান্বিত বিজয়। মাত্র কয়েক মাস আগে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়লগ্নে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের মানুষের জন্য এই নববর্ষ ছিল শেকল ভাঙার উৎসব।

সেদিন রমনার বটমূলে ছায়ানটের গানের সুরে সূর্যের আলো ফোটার আগেই হাজারো মানুষ সমবেত হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। যে শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষায় বাঙালি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, স্বাধীন দেশে প্রথম বৈশাখের প্রভাতে সেখানেই নিবেদন করা হয়েছিল পরম শ্রদ্ধা। শহীদদের রক্তস্নাত সেই বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে বাঙালি জাতি এক নতুন শপথ নিয়েছিল— একটি সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নববর্ষে শেখ মুজিবুর রহমান দেশবাসীর উদ্দেশে এক কালজয়ী বাণী দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশকে আমরা সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলব। এই হোক আমাদের নববর্ষের শপথ।” ১৩৭৮ বঙ্গাব্দের দুঃসহ স্মৃতি, ত্যাগ আর ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে নতুন দেশ গড়ার।

পাকিস্তানি আমলে পহেলা বৈশাখের ওপর যে সাংস্কৃতিক শৃঙ্খল পরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, ১৯৭২ সালে তা পুরোপুরি ছিন্ন হয়। এই প্রথম পহেলা বৈশাখকে সরকারিভাবে ‘জাতীয় ছুটি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঢাকার রাজপথ সেদিন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছিল। যদিও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের মনে স্বজন হারানোর বেদনা ছিল, তবুও স্বাধীনতার আনন্দ ছিল তার চেয়েও বেশি তীব্র। সাধারণ মানুষ দলবেঁধে বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানাতে।

সেদিন পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হয়েছিল বিশেষ ক্রোড়পত্র নিয়ে। দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক বাংলার সম্পাদকীয়তে ধ্বনিত হয়েছিল নতুনের আহ্বান। ‘হে নূতন, এসো তুমি সম্পূর্ণ গগন পূর্ণ করি’—এই আকুতি নিয়েই শুরু হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বর্ষবরণ। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারেও ছিল বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন।

১৩৭৯-এর সেই পহেলা বৈশাখ ছিল ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন সৃষ্টির শপথ নেওয়ার দিন। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সেই নববর্ষটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে কারণ, সেদিন পঞ্জিকার পাতা বদলে যাওয়ার সাথে সাথে বদলে গিয়েছিল একটি জাতির ভাগ্যরেখা। আজ কয়েক দশক পার হয়েও সেই স্বাধীন বৈশাখের তেজ আমাদের প্রেরণা জোগায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *