পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আপাতত অবসান হলেও মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা কাটেনি। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে দুই পক্ষ রাজি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননে ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলায় শান্তিপ্রক্রিয়া এখন খাদের কিনারে। আগামীকাল শুক্রবার পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য ‘ইসলামাবাদ সংলাপ’-এর ঠিক আগ মুহূর্তে লেবাননের এই পরিস্থিতি পুরো চুক্তিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
ট্রাম্পের আল্টিমেটাম ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতা
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত আটটার মধ্যে ইরানকে যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যথায় ইরানের ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংসের হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। তবে সময় শেষ হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতায় দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে:
- জ্বালানি তেল: প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১২০ ডলার থেকে কমে ৯২ ডলারে নেমেছে।
- শেয়ারবাজার: অনিশ্চয়তা কাটায় বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান হয়েছে।
লেবাননে ইসরায়েলি তাণ্ডব
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে বুধবার রাত পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে। বৈরুতসহ বিভিন্ন এলাকায় মাত্র ১০ মিনিটে ১০০টি বিমান হামলা চালানো হয়।
- নিহত: বুধবার রাত পর্যন্ত শিশু ও নারীসহ অন্তত ২৫৪ জনকে হত্যা করেছে ইসরায়েল।
- মানবিক সংকট: জাতিসংঘের কর্মকর্তা ইমরান রেজা জানিয়েছেন, আহতের সংখ্যা এত বেশি যে লেবানন সরকারের পক্ষে তা সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। অন্যদিকে ইরান ও হিজবুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, লেবাননে আগ্রাসন বন্ধ না হলে তারা এই চুক্তি থেকে সরে এসে পুনরায় ইসরায়েলে হামলা চালাতে পারে।
ইসলামাবাদ সংলাপ ও দুই পক্ষের প্রস্তাব
আগামীকাল শুক্রবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিরা স্থায়ী শান্তি নিয়ে আলোচনায় বসবেন। এই আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলোচনার টেবিলে থাকা প্রধান বিষয়গুলো হলো:
| ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব | যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান (ট্রাম্পের দাবি) |
| ইরানের ওপর আগ্রাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা | ইরান কোনোভাবেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে না |
| মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার | মার্কিন সামরিক লক্ষ্য অর্জনের দাবি (বিজয় ঘোষণা) |
| ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া | চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার |
| নিজস্ব নীতি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পরিচালনা | হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা |
শঙ্কায় শান্তিপ্রক্রিয়া
গবেষকদের মতে, লেবাননে ইসরায়েলের এই আগ্রাসন ১৯৮২ সালের ভয়াবহ স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান এই হামলায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। আল-জাজিরার তথ্যমতে, আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে যে তাদের আঙুল এখনো ‘ট্রিগারেই’ আছে।
আগামী দুই সপ্তাহ কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি ইসলামাবাদ সংলাপ সফল না হয় এবং লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘস্থায়ী ও বৃহত্তর যুদ্ধের কবলে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
