দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন রেকর্ড: মাত্র ৫ কার্যদিবসের বিচারে শিশু রামিছা হত্যার ঘাতক দম্পতির মৃত্যুদণ্ড

বিচারিক ইতিহাসে এক অনন্য এবং নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মাত্র ৫ কার্যদিবসের মধ্যে রাজধানীর পল্লবীর আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

রোববার (৭ জুন, ২০২৬) ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ (শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল) এর বিচারক মাসরুর সালেকিন এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।

আইনজীবী ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ গঠন থেকে শুরু করে মাত্র ৫ কার্যদিবসের মধ্যে কোনো হত্যা মামলার রায় দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম। এর আগে দেশের ইতিহাসে এত দ্রুততম সময়ে কোনো ফৌজদারি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়নি।

মাত্র ৫ কার্যদিবসের অবিশ্বাস্য সময়রেখা

গত ১৯ মে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের একটি ফ্ল্যাট থেকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তারের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে প্রশাসন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পদক্ষেপ নেয়। ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায় (২৪ মে) আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে পুলিশ।

এরপর ট্রাইব্যুনাল আদালতের অবকাশকালীন ছুটি বাতিল করে গত ১ জুন (সোমবার) আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। এরপরের কার্যদিবসের সময়রেখা ছিল ঠিক এমন:

  • ১ম দিন (১ জুন): আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন।
  • ২য় দিন (২ জুন): মাত্র এক দিনেই মামলার বাদী, নিহতের মা-বাবা, চিকিৎসক ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ রেকর্ড ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন।
  • ৩য় দিন (৩ জুন): ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি।
  • ৪র্থ দিন (৪ জুন): রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন শেষে রায়ের দিন ধার্য।
  • ৫ম দিন (৭ জুন, রোববার): ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক চূড়ান্ত রায় ও দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা।

আদালতে লোমহর্ষক বিবরণ ও আলামত নষ্টের চেষ্টা

আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে আসে, ঘটনার দিন সকালে শিশু রামিসাকে কৌশলে নিজেদের ঘরে ডেকে নেয় প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া সোহেল রানা। সেখানে বাথরুমে নিয়ে তাকে ওড়না দিয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণের পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা ও হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়।

রামিসার মা ও প্রতিবেশীরা দরজায় ডাকাডাকি করার সময় আসামিরা ভেতর থেকে দরজা না খুলে বাথরুমে মরদেহ টুকরো করার কাজ চালাচ্ছিল। একপর্যায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা সেলাইরেঞ্জ দিয়ে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ঘরের ভেতর থেকেই খাটের নিচে লুকানো ধড় এবং বালতিতে রাখা কাটা মাথাসহ হাতেনাতে আটক করে জনতা। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

ফরেনসিক ও ডিএনএ রিপোর্টেও হত্যার আগে নির্মম ধর্ষণের প্রমাণ মেলে। রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু জানান, আসামিদের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা বিবেচনা করে আদালত এই সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন। এই রায় দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *