দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর দেশের চিনির বাজারে আবারও অস্থিরতা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর কমতির দিকে থাকলেও দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে গত দুই সপ্তাহে চিনির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে পুঁজি করে আমদানিকারক ও মিল মালিকরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।
পাইকারি ও খুচরা বাজারের বর্তমান চিত্র
দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে চিনির দাম মণে প্রায় ২০০-২০৫ টাকা বেড়েছে।
- দুই মাস আগে: মণপ্রতি (৩৭.৩২ কেজি) দাম ছিল ৩,৪০০ – ৩,৪২০ টাকা।
- বর্তমান দর: মণপ্রতি চিনি লেনদেন হচ্ছে ৩,৬১০ – ৩,৬১৫ টাকায়।
- খুচরা বাজার: দুই সপ্তাহ আগে যে চিনি ৯৫-১০০ টাকায় পাওয়া যেত, বর্তমানে তা ১১০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বৈপরীত্য
মজার বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বর্তমানে নিম্নমুখী। গত ২৬ মার্চ প্রতি পাউন্ড চিনির মূল্য ছিল ১৫.৭৭ সেন্ট, যা গত ১৭ এপ্রিল কমে দাঁড়ায় ১৩.৪৮ সেন্টে। বিশ্ববাজারে দাম কমলেও আমদানিকারক পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে দাম বাড়ানোর একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কেন বাড়ছে চিনির দাম?
ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দাম বাড়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে:
- জৈব জ্বালানি ও যুদ্ধ পরিস্থিতি: ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে (ইসরায়েল-ইরান) শুরু হওয়া সামরিক উত্তজনা এবং দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে।
- কৃত্রিম সংকট ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ: বাংলাদেশ চিনি ডিলার সমিতির অভিযোগ, বড় বড় পরিশোধন মিলগুলো হঠাৎ করে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো মিল সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
- মজুদ প্রবণতা ও লোকসান পুষিয়ে নেওয়া: ডিও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ গত কয়েক বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে বর্তমান সংকটকে পুঁজি করে চিনি মজুদ করছেন। সামনে মধুমাস (আম, কাঁঠাল, লিচুর মৌসুম) আসায় চিনির চাহিদা আরও বাড়বে, সেই সুযোগটিই নিচ্ছেন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো।
শিল্প খাতে প্রভাব
চিনির দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে। ইতিমধ্যে রুটি, বিস্কুট এবং কনফেকশনারি পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। সাধারণ ভোক্তারা বলছেন, সরকারের নজরদারির অভাবে বারবার ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হচ্ছে।
“দীর্ঘ কয়েক বছর পর চিনির বাজার স্থিতিশীল হয়েছিল। কিন্তু মিল গেট থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার কারণে গ্রীষ্মের এই বাড়তি চাহিদার সময়ে সাধারণ মানুষকে আবারও বেশি দামে চিনি কিনতে হচ্ছে।” > — আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ চিনি ডিলার সমিতি।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বাজার আবারও নিম্নমুখী হবে। তবে সাধারণ ভোক্তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের সুফল পেতে এবং কৃত্রিম সংকট রোধে এখনই সরকারি কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।
