চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার রৌফাবাদ বিহারি কলোনিতে গত ৭ মে রাতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়া ১১ বছর বয়সী শিশু রেশমি আক্তার এক সপ্তাহ মৃত্যুর সাথে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মেনেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়।
যে আঁধারে হারিয়ে গেল একটি শৈশব
ঘটনার রাতে রেশমি মায়ের জন্য পান কিনতে বাড়ির কাছের দোকানে যাচ্ছিল। রাত সাড়ে নয়টার দিকে পাঁচ-ছয়জন মুখোশধারী সশস্ত্র যুবক রৌফাবাদ শহীদ মিনার লেনে এসে হাসান রাজু (২৪) নামে এক যুবককে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। রাজু ঘটনাস্থলেই মারা যান। সেই গুলির একটি ছুটে গিয়ে লাগে রেশমির বাঁ চোখে — মাথার পেছনে গিয়ে আটকে যায়। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী এই শিশু পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল।
চমেকের চিকিৎসকরা জানান, বুলেটটি মস্তিষ্কের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ ভেদ করে আটকে থাকায় অস্ত্রোপচার সম্ভব ছিল না — তা করলে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হতে পারত। মাল্টি-অর্গান ফেইলিউরে আক্রান্ত হয়ে রেশমি আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে ছিল। সাত দিন লড়াই করে সে আর ফিরে আসেনি।
রেশমির বাবা রিয়াজ আহমেদ একজন সবজি বিক্রেতা। মেয়ে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে থাকার সময় তিনি বলেছিলেন, “আজ আমার মেয়ের সাথে হয়েছে, কাল আরেকজনের সাথে হবে। আমরা আতঙ্কে বাস করছি।”
প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে চট্টগ্রাম
পুলিশ তদন্তে জানা গেছে, রাজু হত্যা নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২৬ এপ্রিল রাউজানে নাসির উদ্দিন ওরফে মধু নাসির নিহত হওয়ার প্রতিশোধ নিতেই রাজুকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে গ্রেপ্তার আসামিরা। রাজু সেই মধু নাসির হত্যা মামলার সপ্তম আসামি ছিল। পুলিশ মূল আসামি সৈয়দুল করিমসহ মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এই হত্যাকাণ্ড চট্টগ্রামের রাউজান-বায়েজিদ অঞ্চলে চলমান ভয়াবহ সহিংসতার একটি অংশ মাত্র। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত শুধু রাউজানেই ২৩ জন নিহত হয়েছেন — যাদের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যুকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই সময়ের মধ্যে শতাধিক সংঘাত ও গুলির ঘটনায় সাড়ে তিনশোরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগ গুলিবিদ্ধ।
আগস্ট ৫-এর পট পরিবর্তনের পর বিএনপির নেতা-কর্মীরা এলাকায় ফেরত আসতে শুরু করেন এবং প্রায়ই পরস্পরবিরোধী দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। বায়েজিদ, চান্দগাঁও ও রাউজান এলাকায় বালু ব্যবসা, পরিবহন এবং চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী। চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, হাটহাজারি ও রাউজান থানার অধীন পাঁচ লাখেরও বেশি বাসিন্দা এই গ্যাং-এর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
নিরীহ শিশুর মূল্য কে দেবে?
রেশমির মৃত্যু এই সহিংসতার বিভীষিকার সবচেয়ে নির্মম প্রতিফলন। সে কোনো দ্বন্দ্বের অংশ ছিল না — সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যও ছিল না। পান কিনতে বেরিয়ে একটি মেয়ে লাশ হয়ে ফিরল — এটাই এখন চট্টগ্রামের বায়েজিদ-রাউজান অঞ্চলের বাস্তবতা।
ছয় আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে, মামলা হয়েছে — কিন্তু রেশমির পরিবারের প্রশ্ন, আর কতটা মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে?
