জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্তে বড় ধরনের তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশ ও তদন্ত সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন ঘিরে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলায় ৫ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে হয়রানিমূলকভাবে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় আদালতে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১৬ মে পর্যন্ত ৭৯৮টি মামলায় মোট ৫ হাজার ৭৪ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে অন্তত ৪০টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
রাব্বি হত্যা মামলা: ২২ আসামির মধ্যে ১০ জনের সম্পৃক্ততা পায়নি পিবিআই
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর বাংলামটরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হন বেলাল হোসেন রাব্বি। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় তার মা জেসমিন আক্তার শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।
তদন্তে নামে Police Bureau of Investigation (পিবিআই)। সংস্থাটি এজাহারভুক্ত ২২ আসামির মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়নি।
তবে এজাহারে থাকা ১২ জনের পাশাপাশি তদন্তে নতুনভাবে শনাক্ত আরও ৬ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় আদালতে ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মামলার সামগ্রিক চিত্র
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী:
মোট মামলা
- ১,৮৫৫টি মামলা
এর মধ্যে
- ৭৯৯টি হত্যা মামলা
- ১,০৫৬টি হত্যাচেষ্টা ও অন্যান্য মামলা
এখন পর্যন্ত তদন্ত ও অভিযোগপত্রের অগ্রগতি
অভিযোগপত্র দাখিল
- ১৭৫টি মামলায় চার্জশিট
- মোট আসামি: ১৩,৮২৪ জন
হত্যা মামলায়
- মামলা: ৪৯টি
- আসামি: ৪,৭২৩ জন
- এজাহারনামীয়: ৩,২৭১ জন
- তদন্তে নতুন শনাক্ত: ১,৪৫২ জন
হত্যাচেষ্টা ও অন্যান্য ধারার মামলায়
- মামলা: ১২৬টি
- আসামি: ৯,১০১ জন
- এজাহারনামীয়: ৬,১৭৪ জন
- তদন্তে নতুন শনাক্ত: ২,৯২৭ জন
৫ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে অব্যাহতির সুপারিশ
ফৌজদারি কার্যবিধিতে যুক্ত হওয়া ধারা ১৭৩(এ) অনুযায়ী, তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত ব্যক্তিদের অব্যাহতির সুপারিশ করতে পারছে পুলিশ।
এই ধারার আওতায় বিভিন্ন মহানগর ও রেঞ্জ এলাকায় শত শত মামলায় হাজারো মানুষের বিরুদ্ধে দায়মুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান
| এলাকা | মামলা | অব্যাহতির সুপারিশ |
|---|---|---|
| ডিএমপি | ৩৫৪ | ৩,৮৪৯ জন |
| এসএমপি | ৩৯ | ১৪৪ জন |
| সিএমপি | ১৯ | ৫২ জন |
| জিএমপি | ১২ | ২১ জন |
| আরএমপি | ১০ | ২৫ জন |
| বরিশাল মেট্রো | ৩ | ৬ জন |
| কেএমপি | ১ | ৫ জন |
| আরপিএমপি | ২ | ৬ জন |
বিভিন্ন রেঞ্জে অব্যাহতির সুপারিশ
- ঢাকা রেঞ্জ: ৪৮৫ জন
- চট্টগ্রাম রেঞ্জ: ৯৫ জন
- খুলনা রেঞ্জ: ৫৮ জন
- রংপুর রেঞ্জ: ৮ জন
- রাজশাহী রেঞ্জ: ২৮ জন
- ময়মনসিংহ রেঞ্জ: ৬০ জন
- বরিশাল রেঞ্জ: ১৭ জন
- সিলেট রেঞ্জ: ১৪০ জন
পিবিআই তদন্তে বড় তথ্য: ৬১% আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ মেলেনি
পিবিআই মোট ২৭২টি মামলার তদন্ত শুরু করে। এর মধ্যে:
- ৮৪টি হত্যা মামলা
- ১৮৮টি অন্যান্য মামলা
গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত:
- ১৬৫টি মামলার তদন্ত নিষ্পত্তি
- তদন্তাধীন: ১০৭টি মামলা
নিষ্পত্তি হওয়া মামলার ফলাফল
| অবস্থা | সংখ্যা |
|---|---|
| অভিযোগ প্রমাণিত | ১১১ |
| চূড়ান্ত প্রতিবেদন | ৩১ |
| অন্যান্যভাবে নিষ্পত্তি | ২৩ |
তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া ১১১ মামলায় এজাহারভুক্ত মোট ৯,৬৯১ জন আসামির মধ্যে ৬১.১ শতাংশের বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফলে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
“স্বচ্ছ তদন্ত ও নিরপরাধদের হয়রানি বন্ধে গুরুত্ব”
পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন—
“জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্তে ধারাবাহিক অগ্রগতি হচ্ছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন—
“ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩(এ) ধারার কার্যকর প্রয়োগ বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানি বন্ধ, তদন্তে স্বচ্ছতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মান আরও উন্নত হয়।”
১৯৭ আসামির মামলায় জড়িত পাওয়া গেছে ৩৮ জনকে
জুলাই অভ্যুত্থানের আরেক ঘটনায় মুদি দোকানি মো. জামাল মালিবাগ এলাকায় আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। পরে তিনি হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন।
মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ১৯৭ জনকে আসামি করা হয়।
পিবিআই তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেলেও মাত্র ৩৮ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। বাকি ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
“তদন্তাধীন মামলার ৯০ শতাংশ কাজ শেষ”
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) আবু ইউসুফ বলেন—
“যে ১০৭টি মামলা তদন্তাধীন, তার প্রায় ৯০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন—
“সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমতি, মেডিকেল সনদ ও অন্য মামলার সঙ্গে একত্রে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কারণে কিছু বিলম্ব হচ্ছে। তবে অতি শিগগিরই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
