ভোলার চরাঞ্চলে দুর্যোগে চরম ঝুঁকি: আশ্রয়কেন্দ্র সংকটে অরক্ষিত লাখো মানুষ

ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে পড়েছে লাখো মানুষ, যেখানে পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টারের অভাবে বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

মহিষের বাথানিয়া (রাখাল) মো. মাকসুদ জানান, দুই বছর আগে জোয়ারে তার ১০টি মহিষ ভেসে যায়, যার মধ্যে ৮টি উদ্ধার হলেও ২টি আর পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, চরবাসীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বা কেল্লা না থাকায় প্রতি বছরই গবাদিপশু ও সম্পদের বড় ক্ষতি হয়।


চরাঞ্চলের বাস্তবতা

ভোলার দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের মধ্য মেঘনার চরসহ আশপাশের এলাকায় দুর্যোগের সময় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। সরেজমিন তথ্য অনুযায়ী:

  • জেলার ২১টি চরের মধ্যে ৯টিতে কোনো সাইক্লোন শেল্টার নেই
  • বাকি ১২টি চরে অপর্যাপ্ত সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র
  • মোট আশ্রয়কেন্দ্র: ৯১৫টি (স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার)

তবে এই কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ প্রায় ৫ লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারেন, যেখানে জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখ

ফলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ দুর্যোগকালে সরাসরি ঝুঁকিতে থাকেন


চরম ঝুঁকিতে নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল

মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী চরগুলোতে রয়েছে:

  • নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি
  • যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন
  • বর্ষায় নৌকা ছাড়া যাতায়াত সম্ভব নয়

চর মুন্সীর বাসিন্দা মরিয়ম বিবি জানান—

“ঝড়বৃষ্টি হলে ঘরেই বন্দি থাকতে হয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করেই দিন কাটে।”

ব্যবসায়ী মিলন পাটোয়ারীর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ষায় মেঘনার পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৭–৮ ফুট উঁচুতে প্রবাহিত হয়, ফলে পুরো চর প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষতি হয়।


গুরুত্বপূর্ণ চরের তালিকা (যেখানে আশ্রয়কেন্দ্র নেই)

স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্রবিহীন বা সংকটপূর্ণ চরগুলো:

  • ঢালচর, পূর্ব ঢালচর
  • চর লাদেন, চর লক্ষ্মী
  • চর হাজিপুর, চর সামসুদ্দিন
  • কাজিরচর, চর সুলতানি
  • চর কচুয়াখালীসহ একাধিক চর

এসব চরে বসবাস করেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ, যারা দুর্যোগের সময় চরম অনিরাপত্তায় থাকেন।


আশ্রয়কেন্দ্রের বাস্তব চিত্র

জেলা অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা:

  • সদর: ১৩৭টি (প্রায় ৫ লাখ মানুষ)
  • দৌলতখান: ১১২টি (১.৭২ লাখ মানুষ)
  • বোরহানউদ্দিন: ১২২টি (২.৬৫ লাখ মানুষ)
  • তজুমদ্দিন: ৭৬টি
  • লালমোহন: ১৯৮টি
  • চরফ্যাসন: ১৬৫টি
  • মনপুরা: ৫৯টি

শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র জরাজীর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।


জরাজীর্ণ অবকাঠামোর চিত্র

চরফ্যাসনের চর কুকরি-মুকরি ইউনিয়নের একটি আশ্রয়কেন্দ্র সম্পর্কে বলা হয়েছে:

  • তিন দশক পুরোনো ভবন
  • ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে
  • ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায়

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য

মদনপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হেলাল উদ্দিন বলেন—

“আমাদের ইউনিয়নে প্রায় ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র দুটি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। চরমুন্সীতে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই।”

তিনি আরও বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছে।


প্রশাসনের বক্তব্য

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আজিম উদ্দিন জানান—

  • নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে
  • ৭টি চরে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ চলছে
  • দুর্যোগে মানুষ ও গবাদিপশু উভয়ের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হবে

জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন—

  • অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে
  • জরাজীর্ণ কেন্দ্র সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
  • সবাইকে দুর্যোগ নিরাপত্তার আওতায় আনার উদ্যোগ চলছে

ভোলার চরাঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্রের তীব্র সংকট, অবকাঠামোর দুর্বলতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা মিলিয়ে পরিস্থিতি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *