সীমান্ত উত্তেজনায় চরম অস্থিরতা: আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ ঘোষণা পাকিস্তানের

সীমান্ত সংঘাত

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান সীমান্ত উত্তেজনা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ প্রকাশ্যে আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ বা ‘ওপেন ওয়ার’-এর ঘোষণা দিয়েছেন। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের এই সংঘাত এখন নতুন মোড় নিয়েছে, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংঘাতের শুরু ও ‘গজব লিল হক’ অভিযান

বৃহস্পতিবার রাতে আফগানিস্তানের তালেবান বাহিনী পাকিস্তানের বিভিন্ন সীমান্ত চৌকিতে আক্রমণ শুরু করে। আফগান প্রশাসনের দাবি, পাকিস্তানের বোমাবর্ষণের জবাবে তারা এই হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান শুক্রবার ভোরে শুরু করে ‘গজব লিল হক’ (Operation Righteous Fury) বা ‘সঠিক ক্রোধের অভিযান’।

পাকিস্তানের বিমানবাহিনী কাবুলের পাশাপাশি পাক্তিয়া ও কান্দাহার প্রদেশে হামলা চালিয়েছে। কান্দাহারকে তালেবানদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসলামাবাদের দাবি, তারা আফগানিস্তানে তালেবানদের প্রতিরক্ষা স্থাপনা ও বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

আতঙ্কে কাবুলের বাসিন্দারা

সংঘাতের তীব্রতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাবুল বাসিন্দা জানান, শুক্রবার ভোরে তীব্র বিস্ফোরণের শব্দে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। তিনি বলেন, “আমি ভীষণ আতঙ্কিত ছিলাম। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আকাশের দিকে আগুনের গোলার মতো কিছু উঠতে দেখি। প্রতিটি কাবুলবাসী এখন বোমার আঘাতে মৃত্যুর ভয়ে দিন কাটাচ্ছে।”

এদিকে, পাকিস্তানের বাজাউর জেলায় তালেবানদের ছোড়া মর্টারের আঘাতে দুই শিশু ও একজন নারীসহ পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, পাকিস্তান তালেবানরা দেশটির ভেতর থেকে ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছিল, যা তারা প্রতিহত করেছেন।

হতাহতের তথ্যে ভিন্নমত

সংঘাতের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই দেশ পরস্পরবিরোধী তথ্য দিচ্ছে। পাকিস্তান দাবি করেছে, তাদের অভিযানে ১৩৩ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। অন্যদিকে, আফগান পক্ষ দাবি করেছে তাদের বেশ কয়েকজন যোদ্ধা নিহত ও আহতের পাশাপাশি পাকিস্তানি ৫৫ সৈন্য নিহত হয়েছে।

সংকটের শিকড় ও প্রেক্ষাপট

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে জটিল। ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবান ক্ষমতায় ফিরলে পাকিস্তান শুরুতে তাদের সমর্থন দিলেও, বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামাবাদ অভিযোগ করছে, আফগানিস্তানের মাটিতে আশ্রয় পাওয়া টিটিপি (তহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) জঙ্গিরা পাকিস্তানে সহিংসতা চালাচ্ছে। তাদের মতে, গত এক বছরে পাকিস্তানে প্রায় ১,২০০ জন নিহত হয়েছে, যা ২০২১ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। খাজা মুহাম্মদ আসিফ বলেন, “বিশ্বের সব সন্ত্রাসীদের তারা (আফগানিস্তান) জড়ো করেছে। আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।”

সামরিক সক্ষমতার বৈষম্য

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (IISS)-এর ‘মিলিটারি ব্যালেন্স ২০২৫’ অনুযায়ী, সামরিক শক্তিতে পাকিস্তান অনেক এগিয়ে। পাকিস্তানের প্রায় ৬,৬০,০০০ সক্রিয় সেনা এবং আধুনিক বিমানবাহিনীর (F-16, JF-17) বিপরীতে তালেবানদের কোনো কার্যকর বিমানবাহিনী নেই। তাদের শক্তি মূলত গেরিলা যুদ্ধ ও আত্মঘাতী হামলার কৌশলের ওপর নির্ভরশীল।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ পরিস্থিতি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আঞ্চলিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে সৌদি আরব, তুরস্ক বা কাতারের মতো দেশগুলোর মধ্যস্থতা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *