মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংঘাত আপাতত এড়ানো গেছে। মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেধে দেওয়া সামরিক অভিযানের সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের এক সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় তেহরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে রাজি হয়েছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং চীনের কূটনৈতিক চাপে এই সমঝোতা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তেহরানের পক্ষ থেকে একটি ১০ দফা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে, যেটিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার একটি “কার্যকর ভিত্তি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইরানের উত্থাপিত ১০ দফা পরিকল্পনা
ইরানি গণমাধ্যম এবং কূটনৈতিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের ১০টি শর্ত নিচে দেওয়া হলো:
১. সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর আরোপিত সকল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে তুলে নিতে হবে। ২. নৌ-সার্বভৌমত্ব: হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকবে। ৩. ট্রানজিট ফি: প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজ থেকে ইরান ও ওমান সর্বোচ্চ ২০ লক্ষ ডলার পর্যন্ত ফি আদায় করতে পারবে, যা দেশের পুনর্গঠন কাজে ব্যয় হবে। ৪. মার্কিন সেনা প্রত্যাহার: মধ্যপ্রাচ্য থেকে সকল মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নিতে হবে। ৫. হামলা বন্ধ: ইরান এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর সব ধরনের সামরিক আক্রমণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। ৬. জব্দ সম্পদ মুক্তি: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে আটকে থাকা ইরানের সকল আর্থিক সম্পদ অবিলম্বে অবমুক্ত করতে হবে। ৭. পরমাণু সমৃদ্ধকরণের অধিকার: ইরানের পরমাণু কর্মসূচির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের স্পষ্ট স্বীকৃতি দিতে হবে। ৮. আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা: চুক্তিটিকে আইনত বাধ্যতামূলক করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি রেজোলিউশন পাস করতে হবে। ৯. নিরাপত্তা গ্যারান্টি: ভবিষ্যতে কোনো দেশ যেন একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে না পারে, তার আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দিতে হবে। ১০. আঞ্চলিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ: বাইরের কোনো পশ্চিমা দেশের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্থানীয় দেশগুলোর মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাঠামো তৈরি করতে হবে।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের দাবিটি এই আলোচনার সবচেয়ে কঠিন বিষয় হতে পারে। মার্কিন সিনেটর ক্রিস মার্ফি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানকে এই জলপথের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ দেওয়া বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য “বিপর্যয়কর” হতে পারে। তবে বর্তমানে প্রণালীটি খুলে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
ইসলামাবাদে পরবর্তী বৈঠক
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যিনি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখছেন, আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে উভয় পক্ষকে আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দফতর জানিয়েছে যে, তারা হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে, তবে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং তেলের ক্রমবর্ধমান দামের চাপে ট্রাম্প প্রশাসন এই ১০ দফা প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে যেতে আগ্রহী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
