দেশে হামের ব্যাপক বিস্তার: ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে সংক্রমণ, শিশুমৃত্যু বাড়ছে

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় (৯১%) হামের সংক্রমণ ছড়িয়েছে, যা পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুতর করে তুলেছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিশু আক্রান্ত হওয়া এবং টিকাদানের ঘাটতির কারণে রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতায় বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৯৮ শিশু। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১৭২ শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং ৮৬০ শিশু উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে

প্রধান পরিসংখ্যান (১৫ মার্চ – ১৪ এপ্রিল বিশ্লেষণ)

  • মোট সন্দেহভাজন রোগী: ১৯,১৬১ জন
  • পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী: ২,৮৯৭ জন
  • বিস্তারিত বিবরণে নিশ্চিত রোগী: ২,৯৭৩ জন
  • উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু: ১৬৬ শিশু
  • উপসর্গভিত্তিক মৃত্যুহার: ০.৯%
  • নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু: ৩০ শিশু
  • নিশ্চিত মৃত্যুহার: ১.১%

শিশুদের ঝুঁকি বেশি

হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু:

  • ৫ বছরের কম বয়সী: ৭৯%
  • ২ বছরের কম বয়সী: ৬৬%
  • ৯ মাসের কম বয়সী: ৩৩%

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক শিশু আবার টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হচ্ছে।

টিকাদানের ঘাটতি বড় কারণ

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ আগে হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে:

  • এমআর টিকার ঘাটতি (২০২৪–২৫)
  • নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক
  • ২০২০ সালের পর সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচির অভাব

এসব কারণে ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়েছে এবং বর্তমান প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়েছে।

ঝুঁকি ‘উচ্চ’ ঘোষণা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে ‘উচ্চ ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সীমান্ত এলাকা ও বড় শহর যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞের মতামত

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন—

“দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোরও কিছুটা দায় রয়েছে। তবে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর।”

তিনি আরও বলেন—

“ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সংক্রমণ বড় আকারে বৃদ্ধির আশঙ্কা কমেছে। তবুও টিকাদান সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কিছু মৃত্যুর ঝুঁকি থেকেই যায়।”

মাঠপর্যায়ের তদারকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন—

“স্বাস্থ্য সহকারীরা সঠিকভাবে কাজ করছেন কিনা, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদেরও টিকাদান কার্যক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে।”

করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা যে পদক্ষেপগুলোর ওপর জোর দিয়েছেন:

  • টিকাদানের কভারেজ অন্তত ৯৫% নিশ্চিত করা
  • নজরদারি জোরদার করা
  • সীমান্ত এলাকায় বিশেষ সতর্কতা
  • ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে টিকা প্রদান
  • পর্যাপ্ত টিকা ও সরঞ্জাম মজুদ রাখা

বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের হাম নির্মূলের অগ্রগতিতে ধাক্কা লেগেছে এবং সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *